জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে কী কী সরানো হয়েছে—এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদের অভিযোগের তালিকাটা পড়ছিলাম।
একটা-দুইটা জিনিস হলে হয়তো বলতাম কিউরেটোরিয়াল সিদ্ধান্ত। কিন্তু অভিযোগগুলো পাশাপাশি রাখলে অন্য প্রশ্ন আসে—
বাদ পড়া জিনিসগুলোর প্রায় সব ভারত-সংক্রান্ত কেন?
* জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ‘বর্ডার কিলিং রুম’ ছিল। সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
* ফেলানীর ভাস্কর্য ছিল। এখন নাই।
* মোদি-বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ছিল। সেটাও নাই করে দেওয়া হয়েছে।
* ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ অংশে প্রণব মুখার্জির বইয়ের রেফারেন্স ছিল। এটাও নাই।
* এছাড়া জুলাইয়ের ‘লংমার্চ টু ঢাকা’র অংশও সরানো হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে সংঘটিত নিপীড়নের ইতিহাসের অংশ ছোট করা হয়েছে।
এসব ইতিহাস অপসারণের পর প্রশ্নটা আর শুধু “জাদুঘর থেকে কী বাদ গেল?” থাকে না।
তখন প্রশ্ন জাগে—জুলাইয়ের ইতিহাস থেকে কী আড়াল করা হচ্ছে, আর এর মধ্য দিয়ে কাকে বাঁচানো হচ্ছে?
জুলাইকে শুধু শেখ হাসিনা-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক পটভূমির বড় একটা অংশ বাদ পড়ে যায়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত হত্যা, ভারতের প্রভাব এবং দিল্লির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায্য সম্পর্ক নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল এবং আছে। সেই ইতিহাস কেন লুকানো হচ্ছে?
ফেলানী সেই ইতিহাসের প্রতীক। সীমান্ত হত্যা সেই ইতিহাসের অংশ। মোদি-বিরোধী আন্দোলনও তা-ই।
তাহলে এগুলো সরানো হলো কেন?
আর প্রণব মুখার্জির বইয়ের রেফারেন্স সরানোর অভিযোগটি আরও ইন্টারেস্টিং। এটা তো বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর হওয়ার কথা না। তাহলে কে সরাল? কোন যুক্তিতে?
নাকি সরকার বদলায়, কিন্তু দিল্লিকে অস্বস্তিতে না ফেলার আওমি অভ্যাস বদলায় না?
এসব দেখে এখন অন্তত বুঝতে খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে না, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই জাদুঘর খুলতে দেওয়া হলো না কেন। উদ্বোধন পিছিয়ে কেন এই সময়ে আনা হলো।
যদি এনসিপির অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্নটা গুরুতর—
সময়টা কি জাদুঘর শেষ করার জন্য নেওয়া হয়েছিল, নাকি ইতিহাসটা নতুন সরকারের জন্য সুবিধাজনকভাবে সাজানোর জন্য?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাদুঘর খুলল না। নতুন সরকার এসে খুলল। আর খুলে দেখা গেল ভারত-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একের পর এক কনটেন্ট নেই।
জাদুঘর নিয়ে প্রশ্ন এখানেই শেষ না। উদ্বোধনের দিন থেকেই টিকিট নিয়ে অভিযোগ—বড়দের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে ২০ টাকার শিশুদের টিকিট দেওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। শিল্পীদের পাওনা নিয়েও অভিযোগ আছে।
এগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাও কঠিন। কারণ একই ৫ আগস্ট বিএনপি সরকারের প্রথম গণঅভ্যুত্থান দিবসে আমরা দেখেছি—জুলাইয়ের ইতিহাস দখলের চেষ্টা।
জুলাই নিয়ে রাষ্ট্রীয় তথ্যচিত্র ছিল বিকৃতিতে ভরা। যা দেখে এনসিপি নেতারা বেরিয়ে গেছেন। যেখানে গণঅভ্যুত্থানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন জুলাই মূলত বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। এমনকি এক দফার ইতিহাসও তারা নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করেছে।
অথচ জুলাইয়ের মানুষেরা এখনও জীবিত। লাখ লাখ ভিডিও, ছবি, সংবাদ এখনও আছে।
এখনই যদি ইতিহাস দখল ও বিকৃত করা শুরু হয়, বিশ বছর পর কী লেখা হবে?
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তি বানিয়েছিল। বিএনপি যদি জুলাইয়ের সঙ্গে একই কাজ করে, তাহলে তারা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে খারাপ রাজনৈতিক অভ্যাসেরই পুনরাবৃত্তি করল।
জুলাই বিএনপির না। এনসিপির না। জামায়াতেরও না। জুলাই তাদের সবার, যারা রাস্তায় ছিল, মরেছে, আহত হয়েছে, খুনি হাসিনার সামনে দাঁড়িয়েছে।
যার যতটুকু ভূমিকা, ইতিহাসে তার ততটুকুই থাকবে।
ইতিহাসের কাজ পছন্দের বিষয় রাখা আর অপছন্দের বিষয় মুছে দেওয়া না।
ভারত আমাদের প্রতিবেশী। সম্পর্ক থাকবে, কূটনীতি থাকবে, বাণিজ্য থাকবে। কিন্তু সেই সম্পর্কের জন্য ফেলানীকে ইতিহাস থেকে সরাতে হবে কেন? সীমান্ত হত্যা লুকাতে হবে কেন? মোদি-বিরোধী আন্দোলন অস্বস্তিকর হবে কেন?
ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর ভারত বিষয়ক ইতিহাস সেন্সর করা এক জিনিস না।
বন্ধুত্ব সমানে সমানে হয়। তাঁবেদারি হয় মাথা নিচু করে। আর ক্ষমতার জন্য সেই তাঁবেদারি আমরা বহু বছর দেখেছি।
তাই সরকারের কাছে দাবি খুব সাধারণ—আসিফ মাহমুদের অভিযোগগুলোর পয়েন্ট বাই পয়েন্ট জবাব দিন। কী ছিল, কী সরানো হয়েছে, কে সরিয়েছে, কেন সরিয়েছে—প্রকাশ করুন।
অভিযোগ মিথ্যা হলে প্রমাণ করুন। সত্য হলে জিনিসগুলো ফিরিয়ে দিন।
কারণ জুলাইয়ের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের সেন্সরশিপ শেষ করে বিএনপির সেন্সরশিপ বসানোর জন্য মানুষ জীবন দেয় নাই।
জুলাই জাদুঘর থেকে ভারতের নোংরামির ইতিহাস সরিয়ে ফেললেই ইতিহাস বদলানো যাবে না।
বরং নতুন একটা ইতিহাস লেখা হবে—
ক্ষমতা বদলেছে।
কিন্তু দিল্লিকে ভয় পাওয়ার অভ্যাসটা বদলায়নি বিএনপি।