দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ক্যান্টিন পরিচালনা করছি, হলের ছাত্ররাই আমার কাছে সবকিছু। হলের অধিকাংশ ছাত্র মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, মাসের সব সময় তাদের হাতে টাকা থাকে না। অনেকেই টিউশনি করে নিজের পরিবারকেও টাকা পাঠায়। তাই ছাত্রদের পকেটে টাকা না থাকলেও তাদের বিনা পয়সায় খাওয়াই।—অশ্রুসিক্ত নয়নে আবেগাপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল ও স্যার এ এফ রহমান হল সংলগ্ন ক্যান্টিনের পরিচালক হেলাল উদ্দিন।
ক্যান্টিনে পচা-বাসি খাবার বিক্রির অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার রাতে তার নিয়োগের চুক্তিপত্র বাতিল করে ক্যান্টিনে তালা ঝুলিয়ে দেয় হল প্রশাসন।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, রাত ৯টার দিকে বাসি খাবার বিক্রির অভিযোগ তোলেন কিছু শিক্ষার্থী। খবর পেয়ে এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ আলম চৌধুরী, চাকসুর ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ এবং সহকারী প্রক্টর বাদশা মিয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে প্রশাসন বৈঠক করে হেলাল উদ্দিনের চুক্তিপত্র বাতিল ও ক্যান্টিনটি সিলগালা করে দেয়। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন না অপর যৌথ অংশীদার আলাওল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জামালুল আকবর চৌধুরী।
দীর্ঘ ২০ বছরের পুরানো এই ক্যান্টিন পরিচালকের চুক্তিপত্র বাতিল ও তালা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঘটনাটির পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ গ্রুপে চবি শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন লেখেন, ক্যান্টিন পরিচালক অনেক ভালো মানুষ। তাকে এভাবে বের করে দেওয়া ঠিক হয়নি। তার ক্যান্টিনে বহু শিক্ষার্থী বিনা পয়সায় খেয়েছে। এ ছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর খাবারের দামও ছিল সহনীয় পর্যায়ে।
আলাওল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাকছুদুর রহমান জানান, ক্যান্টিন পরিচালক খুবই দয়ালু ও সৎ মানুষ। তার ক্যান্টিনে গিয়ে কখনোই কাউকে খালি পেটে ফিরতে হয়নি। পকেটে টাকা না থাকলেও তিনি নীরবে ছাত্রদের খাইয়েছেন, কোনো হিসাব রাখেননি। শুধু ব্যবসায়ী নন, তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন আপনজনের মতো। তার কাছে আমারও এখনও কিছু টাকা বাকি রয়েছে।
ধার-দেনা করে ক্যান্টিন চালান জানিয়ে পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, আমি মূলত ছাত্রদের জন্যই ক্যান্টিনটা চালিয়ে আসছিলাম। কর্মচারীদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হয়। মুদি দোকানে আমার বড় অঙ্কের টাকা বাকি পড়ে আছে। হঠাৎ করে ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমি একবারে নিরুপায় হয়ে পড়েছি।
এ বিষয়ে চাকসুর পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, ক্যান্টিন পরিচালককে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি ভুল করেছেন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে চাকসু ও হল প্রশাসন সিদ্ধান্তটি পুনরায় বিবেচনা করবে।
আলাওল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জামালুল আকবর চৌধুরী জানান, ক্যান্টিন পরিচালকের চুক্তিপত্র প্রাথমিকভাবে বাতিল করা হয়েছে বলে শুনেছি। যেহেতু এটি আলাওল ও এ এফ রহমান হলের যৌথ মালিকানাধীন ক্যান্টিন, তাই বিষয়টি বিবেচনার জন্য আমরা দ্রুত সভায় বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।