দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দুয়ার খুলেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের। গতকাল সকালে রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরে অবস্থিত ‘গণভবনে’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন। জাদুঘরের ফলক উন্মোচনের পর সূরা ফাতেহা পাঠ এবং দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন অতিথিরা। পরে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও তার সঙ্গে ছিলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে গড়ে তোলা এই জাদুঘর এতদিন নানা জটিলতার কারণে চালু করা যায়নি। অবশেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলো।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন ছাত্র-জনতা বিজয় উদ্যাপন করতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন দখলে নিয়ে উল্লাস করে। এই উদ্যাপন পরিণত হয় বিজয়ের প্রতীক হিসেবে। সরকার পতনের পর ৮ই আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। এই সরকারের অধীনেই জুলাইয়ের নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে গণভবনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়।
বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এর গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে সাজানো হয়েছে এই জাদুঘরকে। এই জাদুঘরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের চূড়ান্ত পর্বের পাশাপাশি তার আগের দীর্ঘ ‘দুঃশাসনের’ নমুনাও তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও সবার জন্য এ জাদুঘর উন্মুক্ত হবে বৃহস্পতিবার। জনসাধারণ টিকিট কেটে জাদুঘর দেখতে পারবেন। জাদুঘরে প্রবেশের জন্য অনলাইনে টিকিট কাটার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রবেশমূল্য বড়দের ৫০ টাকা এবং ছোটদের জন্য ২৫ টাকা।
উদ্বোধনের দিনই দর্শনার্থীদের ভিড়: ওদিকে গতকাল উদ্বোধনের দিন সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও জাদুঘরের সামনে ভিড় করেন সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া অনেকে ছিলেন। তাদের কেউ কেউ ২৪ সালের ৫ই আগস্ট এই গণভবনে প্রবেশ করে বিজয় উদ্যাপন করেছিলেন। গতকাল তারা এসেছিলেন জাদুঘরে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি দেখতে। দীর্ঘ অপেক্ষা করেও তারা প্রবেশ করতে পারেননি। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে অনলাইনে প্রবেশ টিকিট নিয়ে আজ থেকে যে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন।
সরজমিন দেখা যায়, উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে তৈরি করা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের’ গেটের সামনে এক উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। বাদাম, ফুচকা, আইসক্রিমসহ বিভিন্ন পণ্যের পশরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। সরাকরি ছুটির দিন হওয়ায় জাদুঘরের সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমান সাধারণ মানুষেরা। অনেকেই আবার এসেছিলেন স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। কেউ আবার এসেছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। অনেকে ঢাকার বাইরে থেকেও এসেছেন। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল- জুলাই জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করা। গত দুই বছর কী কী তৈরি করা হয়েছে গণভবনের ভেতরে তা নিজ চোখে দেখা। তবে তাদের সকলকেই বাঁধ সাধে জাদুঘরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মীরা। অনেক মানুষকেই দেখা যায়, ভেতরে ঢোকার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে অনুরোধ করতে।
তবে অনুমতি না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। জাদুঘরের পক্ষ থেকে বলা হয়, উদ্বোধনের দিনে শুধুমাত্র আমন্ত্রিত অতিথি ও গণমাধ্যমকর্মীরা প্রবেশ করতে পারবেন। সাভার থেকে ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আসা কামরুল হাসান বলেন, আমি জানতাম না বৃহস্পতিবার থেকে দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত করা হবে। ছুটির দিন বলে পরিবার নিয়ে চলে এসেছি। এখন না দেখেই ফিরে যেতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ চাইলেই কিছুটা সময় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করতে পারতো। গতকাল সকালে জুলাই জাদুঘর দেখতে মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে জাহিদ হাসানও এসেছিলেন গণভবনের সামনে। তিনি বলেন, আগে তো বলা হয়েছিল, উদ্বোধনের পর থেকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। কিন্তু এসে দেখি আজকে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করানো যাবে না। খুব আশা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছি। যাত্রাবড়ি থেকে এসেছিলেন সাইফুল ইসলাম নামের একজন। সাইফুল বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়িতে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। সে সময় জীবনের তোয়াক্কা না করেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। এজন্য আজ জাদুঘর দেখতে এসেছিলাম।