Image description

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জুন মাসের বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে হইচই হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। মাত্রাতিরিক্ত বিল দেখে বহু গ্রাহক হতভম্ব। তারা বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সামাজিক মাধ্যমেও। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পর গত জুনে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলকে ভুতুড়ে বিল অ্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ইউনিট দেখিয়ে বিল করা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমেও অনেক গ্রাহককে তাদের বিদ্যুৎ বিলের কপি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। বিল করার ক্ষেত্রে ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে, এটি নীতিগত কোনো অনিয়ম নয়। কোনো গ্রাহকের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বিষয়ক কোনো অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল আচরণ করারও অনুরোধ করেছে মন্ত্রণালয়।

ঢাকার আদাবর এলাকার মারুফা আক্তার নামের একজন গ্রাহক তার মে মাসের বিদ্যুৎ বিল দিয়েছেন ২ হাজার ৭৭ টাকা। কিন্তু জুন মাসে একই গ্রাহকের বিল এসেছে ৭ হাজার ১৭০ টাকা। এই বিল দেখে তিনি আঁতকে ওঠেন। নারায়ণগঞ্জ জেলার এক বাসিন্দা জানান, এপ্রিল মাসে বিল এসেছে ৫ হাজার ৮৬৬ টাকা, মে মাসে ৮ হাজার ৯০ টাকা আর জুন মাসে এসেছে ১০ হাজার ৬৫০ টাকা। এটাকে তিনি স্বাভাবিক বিল বলছেন না। রাজধানীর মোহাম্মদবাগ এলাকার বাসিন্দা মাহমুদ মিয়া মানবজমিনকে বলেন, জুন মাসের আগে তার বিদ্যুতের মিটারে এক হাজার টাকা ঢুকালেই এক মাস চলে যেতো।

কিন্তু জুনের পরে এক হাজার টাকা মিটারে জমা করলে ২০ দিন না যেতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। তিনি জানান, জুন মাসে আগে তার বাসায় যেসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল এখনো একই জিনিস ব্যবহার করা হচ্ছে। পার্থক্য হচ্ছে খরচটা অনেক বেড়ে গেছে। তিনি তার এই অতিরিক্ত টাকা বা বিলকে ভুতুড়ে বিল হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির কাছে এর সুষ্ঠু সমাধান দাবি করেন এ গ্রাহক। 
ঢাকার বেইলি রোডের বাসিন্দা একজন সাংবাদিক জানান, জুন মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ২৪০০ টাকা। জুলাইয়ে এসেছে আট হাজারের বেশি। এ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করার পর তার সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন যোগাযোগ করে একটি ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু বিল সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায়ও এমন অনেক অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা। তারা বলছেন, দিনের অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কিন্তু জুনের চেয়ে জুলাইয়ে দ্বিগুণ বিল আসছে। কোথাও কোথাও বিল সংশোধন করে দেয়ার তথ্যও মিলেছে।

পুরান ঢাকার আজিমপুরে এলাকায় ভুতুড়ে বিল নিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি অফিসে প্রতিদিনই বহু অভিযোগ আসছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সেখানকার দায়িত্বরতরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে না নিয়ে এবং যথোপযুক্ত সমাধান না দিয়ে বরং বিষয়টিতে মিডিয়ার খবরকে দায়ী করে নিজেদের গা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (আইটি ও অপারেশন) মো. রবিউল হাসান মানবজমিনকে বলেন, যেসব জায়গায় আমাদের কাছে অভিযোগ আসছে আমরা সেখানে তাৎক্ষণিক অ্যাড্রেস করছি। প্রয়োজনে স্ট্যান্ডার্ড মিটার বসিয়ে চেক করাচ্ছি। আমাদের আঞ্চলিক অফিসগুলোকে বলা আছে যেন গ্রাহকদের অভিযোগ যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করা হয়।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.এম শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিতরণী কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতা করতে হবে। গ্রাহককে এর সুষ্ঠু সমাধান দিতে হবে। গ্রাহকের সঙ্গে সকল প্রকার অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্যাব সোচ্চার থাকবে।

এদিকে, সমসাময়িক বিষয়ে সচিবালয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল প্রসঙ্গে বলেন, অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কোনো নাগরিকের অভিযোগ থাকলে প্রথমে নিকটস্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো উচিত। অভিযোগ জমা দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ না করলে কিংবা প্রতিকার না পাওয়া গেলে সেই বিষয়টিও সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত বিলসংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে আগ্রহী।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ এলে তা সংশোধন করা হয়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, অর্থবছরের শেষ দিকে হিসাব সমন্বয়, রাজস্ব বাড়িয়ে বা সিস্টেম লস কমিয়ে দেখানোর চাপ থাকে। এ কারণে অতিরিক্ত বিল তৈরির অনিয়ম ঘটে।
গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়তি আসার ঘটনা নতুন নয়। অতীতে ভুতুড়ে বিল নিয়ে তদন্তে কারিগরি ত্রুটি, মিটারে সমস্যা ও ঠিকমতো মিটার রিডিং না করার মতো তথ্যপ্রমাণও সামনে আসে। তবে এবারের বিল বৃদ্ধির বিষয়টিতে এ ধরনের কোনো ঘটনা নয়, বরং বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সø্যাব পরিবর্তনের কারণে এমনটি ঘটেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

সম্প্রতি বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অধিকাংশ অভিযোগ ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। এগুলো সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, যতগুলো অভিযোগ আমাদের গোচরীভূত হয়েছে, আমরা প্রত্যেকটা ইনডিভিজুয়ালি অ্যাড্রেস করেছি। অ্যাড্রেস করতে গিয়ে আমরা দেখেছি এর অধিকাংশই আসলে ভুল বোঝাবুঝির কারণে। কারণ গ্রাহক অধিকাংশ ক্ষেত্রে মে মাসের সঙ্গে এপ্রিলের তুলনা করেছে। গত বছরের জুনের সঙ্গে যখন তুলনা করছে, তখন দেখা যাচ্ছে অধিকাংশের সঙ্গে এটা ম্যাচ করছে।

এদিকে জুলাই মাসে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ক্যাবের এক সেমিনারে ভুতুড়ে বিল প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করার কারণে স্ল্যাব পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিল বেড়ে গেছে। মধ্যম ও নিম্নমধ্যম ইনকামের মানুষের বাসায় এয়ারকন্ডিশন রয়েছে। সেই এয়ারকন্ডিশন চলে। নানা কারণে বিদ্যুতের বিল বাড়তে পারে। তারপরেও আমি বলছি না আমাদের লোকজন সৎ। যদিও ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটার দিয়ে কিছুটা কমছে (দুর্নীতি)। বিল নিয়ে আমরা পুরো ইউটিলিটিকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেছি। যেসব জায়গায় অভিযোগ আসছে সেগুলো চেক করছি। আমাদের কাছে একটা রিপোর্ট আসছে। ফলে কিছু সমস্যা আছে। তিনি বিষয়গুলো চেক করে প্রতিবেদন করারও অনুরোধ জানান।

অন্যদিকে, সম্প্রতি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। সোমবার বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এই প্রতিবাদ জানানো হয়। এতে আরও বলা হয়, ইতিমধ্যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত যে সকল অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে তা বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাসমূহ কর্তৃক সমাধান করা হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে কোনো প্রকার অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ নেই। তবে কোনো গ্রাহকের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বিষয়ক কোনো অভিযোগ থাকলে প্রমাণকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করলে সে বিষয়ে অবশ্যই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল আচরণ করারও অনুরোধ করেছে মন্ত্রণালয়।