Image description

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ বাহিনীর পরিবর্তন এবং সংস্কার উদ্যোগের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে যেমন মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছিল, তেমনি আন্দোলনকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেক পুলিশ সদস্য।

অভ্যুত্থানের পর বাহিনীটির শীর্ষ নেতৃত্বে বড় রদবদল এসেছে, অনেকের চাকরি গেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও অভিযানে এখনও নানা দুর্বলতা চোখে পড়ে। পুলিশে সংস্কার আনতে একটি কমিশন গঠনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পুলিশ সপ্তাহে শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরলেও সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি বলেই বাহিনীর অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সাইন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশ এখনো রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হতে পারেনি এবং তাদের মূল সংস্কার কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি।

তার মতে, অনেক পুলিশ সদস্য মামলার আসামি হয়ে পলাতক অবস্থায় আছেন। অন্যদিকে বদলি, চাকরিচ্যুতি বা শাস্তির আতঙ্কে কর্মরতদের মানসিক অবস্থাও ভালো নেই। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব, যার কারণে বাহিনীর ঘুরে দাঁড়াতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক টাইমসকে বলেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে পুলিশ এখনও পিছিয়ে আছে। বারবার হামলার শিকার হয়েও তা তারা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসলেও তাদের মূলধারার পুলিশিং কাজের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। অভ্যুত্থানের সময় ওপরের নির্দেশে কাজ করার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পালিয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ এখন অতিরিক্ত সতর্ক। তারা আর নতুন করে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। এই আস্থার ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর হয়ে উঠছে।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পরও পুলিশের পুরো স্বাভাবিক হতে না পারা নিয়ে চারদিকে নানা আলোচনা চলছে। সরকারের পতনের দিন, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের অসংখ্য থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও যানবাহনে হামলা চালানো হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেদিন ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং আহত হন কয়েকশ সদস্য। আন্দোলনকারীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে বাহিনীর সদস্যরা মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ওই সময়ে সারা দেশে ৪৬০টি পুলিশি স্থাপনায় আক্রমণ করা হয়। এর মধ্যে ৫৮টি থানা ও ২৬টি ফাঁড়িসহ মোট ২২৪টি স্থানে আগুন লাগানো হয়। এ ছাড়া ভাঙচুর চালানো হয় ৫৬টি থানা ও ২৪টি ফাঁড়িসহ ২৩৬টি স্থাপনায়। ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮টি গুলি লুট হয়, যার মধ্যে ১ হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়িগুলো মেরামত করে কাজ শুরু করা হলেও পুলিশ এখন তীব্র যানবাহন সংকটে ভুগছে।

অন্তর্বর্তী সরকার বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও তারা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। এখনো অভিযানে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে, নানা দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর বলপ্রয়োগ না করার যে নীতি চলছে, অপরাধীরা সেটির অপব্যবহার করছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতা বদলের সুযোগে জামিনে মুক্ত হয়ে অনেক দাগী অপরাধী আবার সক্রিয় হয়েছে। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার পুলিশের সামনে নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে খুন-সহিংসতা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের মজুত ও ব্যবহার।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম টাইমসকে জানান, পুলিশ কমিশন গঠন নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এখনো দ্বিধা রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং সামান্য বিষয়েই প্রতিবাদী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে, পুলিশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য অপরাধবিজ্ঞানী ওমর ফারুকের মতে, পুলিশের কাজের মানসিকতায় বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসেনি। তারা জনগণের চাওয়া বুঝতে চায় না, তাদের মনোবল এখনো বেশ দুর্বল।

অপরদিকে, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন স্বীকার করেন, বাহিনীর মনোবল কিছুটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তবে সরকার তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে, জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ কঠোর অবস্থানেই রয়েছে। দায়িত্বে কোনো ধরনের অবহেলা করা হচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।

অধ্যাদেশ জারি হলেও বাস্তবায়িত হয়নি পুলিশ কমিশন

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষের দিকে, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত স্বাধীন পুলিশ কমিশনের বর্তমান রূপ এবং অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই কমিশন আর কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা টাইমসকে বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়টি ছিল কেবল লোক দেখানো, বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। সাধারণ মানুষ চায় পুলিশ তাদের ওপর জুলুম বা অন্যায় অত্যাচার না করুক, কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে পুলিশ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যু হওয়ায় পুলিশ সদস্যদেরকে জনরোষের শিকার হতে হয়েছিল। অপরাধীরা মনে করছে এই মানসিক ধাক্কা থেকে পুলিশ সহজে বের হতে পারবে না এবং কড়া অ্যাকশনে যাবে না। তবে সময় লাগলেও পুলিশকে এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতেই হবে বলে মনে করেন নুরুল হুদা।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, পুলিশের পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে কিছুটা যৌক্তিক সময় লাগবে। বিদায়ী সরকার পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে চরম ভুল করেছিল, যার খেসারত দিতে হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মানুষের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা বেড়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহিতা ও নৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।

এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র ফুটে উঠেছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুনের মামলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এই সময়ে দেশে ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।

হিসাব করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৫৮৫টি হত্যা মামলা হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মামলা বেড়েছে ১৯৩টি।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৪১১টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ১৮৩টি, খুলনায় ১৭৩, রংপুরে ১১০, সিলেটে ১০৮, ময়মনসিংহে ১০৫ এবং বরিশাল বিভাগে সর্বনিম্ন ৯৬টি হত্যা মামলা হয়েছে।