কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েকদিন ধরে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সংকট সহসাই কাটছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রক্ষণাবেক্ষণে থাকা এক্সিলারেটের টার্মিনাল কবে পূর্ণ উৎপাদনে আসবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তারা। তবে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, আজ বুধবার টার্মিনালটি আংশিক চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পুরোপুরি কবে ঠিক হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
বিকল্প ব্যবস্থায় এলএনজি আমদানি: দেশে এলএনজি আমদানি করতে কাতারভিত্তিক ‘কাতারএনার্জি এলএনজি’, ‘কাতারএনার্জি ট্রেডিং’, ওমান ও দুবাইভিত্তিক ‘ওকিউ ট্রেডিং’ এবং মার্কিন কোম্পানি ‘এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং লিমিটেড পার্টনারশিপের’ সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে পেট্রোবাংলার।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর দেশে গ্যাস সরবরাহের চরম অবনতি ঘটে। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক খাত, সিএনজি, শিল্পে ব্যাপক গ্যাস সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামলাতে জরুরিভিত্তিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি সরবরাহে গত ২৬ জুলাই দরপত্র আহ্বান করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। প্রথম দফায় কেউ দরপত্র জমা না দিলেও পরবর্তী সময়ে ২৯ জুলাই আবারও দরপত্র আহ্বান করে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলমান থাকা সামিটের টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। এ ছাড়া আজ বুধবার এলএনজিবাহী আরেকটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এসব এলএনজি আরও কয়েকদিন চলবে।
এলএনজি সরবরাহে যুদ্ধের প্রভাব: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে এলএনজি সরবরাহের প্রধান উৎস কাতারের বিভিন্ন এলএনজি প্লান্ট হামলার শিকার হয়। যার প্রভাব ফেলেছে দেশের এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়ায়। জরুরিকালীন কাতারভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাহিদামাফিক এলএনজি না পাওয়াতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ে উদ্যোগী হয় আরপিজিসিএল। প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, কাতারের সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটায় এঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিকল্প উপায় থেকে এলএনজি ক্রয় করা হচ্ছে।
আবাসিক খাতে দুরবস্থা: ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠান তিতাসের দৈনিক চাহিদা ১৯০ কোটি ঘনফুটের মতো। একটা টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এতে করে আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাত চরম গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত রোববার থেকে তিতাসের গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ছয়টি গ্যাস বিতরণ সংস্থার মধ্যে তিতাস ১২১ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, কর্ণফুলী ২১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদ ২১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট, জালালাবাদ ২৯ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট, পশ্চিমাঞ্চল ৯ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট এবং সুন্দরবন বিতরণ কোম্পানি ৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে।
তাতে করেও আবাসিকের গ্যাস সংকট কাটছে না। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেলায় চুলায় গ্যাস জ্বলছে না। এতে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে গিয়ে বাড়তি খরচও হচ্ছে।
লালমাটিয়ার বাসিন্দা হোসনে আরা বলেন, সকাল থেকে চুলায় কোনো গ্যাস থাকে না। রাত ১২টার পর কিছুটা গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে রান্নাবান্নার কাজ পুরোপুরি করা যায়নি। সবমিলিয়ে চরম ভোগান্তি যাচ্ছে।
পল্লবীর বাসিন্দা ফারজানা আক্তার বলেন, চুলায় গ্যাস না থাকায় রাইস কুকারে ভাত রান্না করছি, তরকারি বাইরে থেকে এনে কিনে খাচ্ছি। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সিলিন্ডার কেনা ছাড়া উপায় নেই। অথচ গ্যাসের লাইন থাকা সত্ত্বেও এ বাড়তি খরচটা করতে হবে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা পারভীন বলেন, গ্যাস না থাকলে প্রতি মাসে বিল ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার এদিকে সিলিন্ডারেও খরচ হচ্ছে। এ ভোগান্তির জবাবদিহি কারও কাছে নেই।
সংকটে সিএনজি ও শিল্প খাত: এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল। গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় তৈরি পোশাক, নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকটের কারণে অন্তত ৮৫টি ডাইং, ৬৫টি নিটিং, ২০টি টেক্সটাইল এবং শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন সরাসরি ব্যাহত হচ্ছে। ২০টি টেক্সটাইল কারখানার মধ্যে মাত্র একটি আংশিক চালু রয়েছে, বাকিগুলোর উৎপাদন কার্যত বন্ধ। ডাইং ও নিটিং খাতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, জুলাই থেকে ডিসেম্বর বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারের মৌসুম হলেও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দিতে অনাগ্রহী হচ্ছেন। সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করতে না পারলে অর্ডার বাতিল, মূল্য কর্তন এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চলমান সংকট অব্যাহত থাকলে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরেও এক সপ্তাহ ধরে অধিকাংশ এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। জেলার প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। অনেক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, কোথাও আবার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের শুধু হাজিরা নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে। সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, বোর্ডবাজার, টঙ্গী, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গোমতী টেক্সটাইল, সাদমা গ্রুপ, সাদমা ফ্যাশন ওয়্যার ও টাওয়াল টেক্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তিতাস গ্যাসের গাজীপুর জোন জানিয়েছে, দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে সাভারে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে। শিল্প-কারখানাগুলো উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এলএনজি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এলএনজিনির্ভর চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
স্টিল, রি-রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেক্সটাইল, স্পিনিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, একই সঙ্গে লোডশেডিংও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। কাফকোতে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধানের তুষ, বায়োমাস, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। গত ২৬ জুলাই তিতাস গ্যাসের নির্দেশনায় যানবাহন ছাড়া ক্যাসকেড সিলিন্ডারে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প ব্যবস্থাও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, অধিকাংশ ডাইং কারখানার উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। দিনে তিন ঘণ্টাও অনেক কারখানায় উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত সমাধান না হলে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান কালবেলাকে বলেন, আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশ কমে গেছে, যার জন্য আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এতে করে ক্লায়েন্টরাও আস্থা হারাচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া থাকবে, জ্বালানি সরবরাহ যেন স্বাভাবিক রাখা হয়।
এ ছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংখ্যা কমে গেছে। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
তেজগাঁওয়ে গ্যাসের অপেক্ষায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. সাইফুল বলেন, সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল নাগাদ ২০০ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছি। এই গ্যাসে সর্বোচ্চ দুটি ট্রিপ চলবে। তখন আবার এসে দাঁড়াতে হবে।
আরেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. সাব্বির বলেন, স্টেশনে অপেক্ষা করেও চাহিদা মাফিক গ্যাস পাচ্ছি না, অথচ দিন শেষে ঠিকই জমার টাকা দিতে হবে। আর্থিক ক্ষতি পোষানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন কালবেলাকে বলেন, টার্মিনালের এই দুর্ঘটনার মাধ্যমে আমাদের এখন সময় এসেছে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার। কোনো দুর্ঘটনা হলে সামনে যাতে এ ধরনের সংকটে পড়তে না হয়, আমাদের সে পরিকল্পনা নিতে হবে। সেটা হতে পারে গ্যাস রিজার্ভ রাখা বা একটা বাড়তি টার্মিনাল তৈরি রাখা।
তিনি আরও বলেন, আমাদের গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনাও বদলাতে হবে। শিল্পে কী করে গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা কমানো যায়, সেটা ভাবতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেরই নিজস্ব গ্যাস নেই, কিন্তু তারাও শিল্পায়ন করছে।
সার্বিক বিষয়ে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান কালবেলাকে বলেন, এক্সিলারেট তাদের টার্মিনালটা ঠিক করতে কাজ করছে। আশা করছি দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।