হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আজ বুধবার। ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল। নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও ক্ষমতায় টিকতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগস্টের ৫ তারিখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বিজয় অর্জিত হয় জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। শুরু হয় নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা। আজ দুই বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সরকার, বিরোধীদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা কর্মসূচি নিয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। নিপীড়ন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে যেভাবে সবাই সজাগ হয়ে উঠেছিল; তাতে জনগণের মাঝে একটি আকাঙ্ক্ষার তৈরি হয়েছিল—স্বৈরতন্ত্রকে রক্ষা না করে রাষ্ট্র হবে গণতান্ত্রিক, গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা; নিপীড়ন ও আধিপত্য থেকে মুক্ত হবে, যার ফলে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বাংলাদেশ। এই প্রত্যাশাগুলো রাজধানীর দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আকারে প্রকাশ পেয়েছিল তখন। তবে দুই বছর পরে এসে সেই প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা কোনো জমাটবাঁধা রূপ নেয়নি।
তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাগুলো প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। শুরু থেকেই গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে সহিংসতা, নৈরাজ্য, লুটপাট, আক্রমণ, ভাঙচুর, মব সন্ত্রাস দেখা যায়। ধীরে ধীরে একটি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে ফের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। জুলাই হত্যা ও হামলার ঘটনার বিচার হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এরই মধ্যে ৬টি মামলার বিচার হয়েছে। এতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হওয়া বাকি। নাগরিক সমাজের মতে, দীর্ঘদিনের চেপে বসা অব্যবস্থাপনা রাতারাতি উপড়ে ফেলা সম্ভব না হলেও মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাষ্ট্রকে আরও দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
যেভাবে ভাঙল দীর্ঘ অচলায়তন: পরপর তিনটি জাল-জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার হরণ, বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে গুম-খুন, ভিন্নমতকে নিষ্ঠুরভাবে দমন, দুর্নীতি, ব্যাংক খাতে অনাচার, অর্থ পাচার, সর্বোপরি ক্ষমতার দম্ভে কার্যত একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল ভোট ও ভাতের অধিকারের অঙ্গীকার করে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ক্ষমতার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিকে জেল-জুলুমের মাধ্যমে বারবার দমন করা হয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে যাবে, জঙ্গিবাদের উত্থান হবে—এ বয়ান তৈরিতে ব্যবহৃত হয় সাহিত্য, সাংবাদিকতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাও। সরকারকে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় রাখতে তৎপর পুলিশ, প্রশাসন হয়ে উঠেছিল নিপীড়নের হাতিয়ার। সরকারের মদদে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনাকে স্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে সরানো অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল। ডামি ভোটখ্যাত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো অনেকটা হাল ছেড়ে দেওয়ায় এ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়।
এর মধ্যেই ২০২৪ সালের ১ জুলাই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাইকোর্টের রায়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সূত্রপাত হয় এই আন্দোলনের। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্রকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আবার বহাল হয়। এর প্রতিবাদে ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন ছাত্ররা।
১ জুলাই সামনে আসে যে নাম—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই ব্যানারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে জড়ো হন। সেখান থেকে ২০১৮ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন পুনর্বহাল করার দাবি জানান। দাবি না মানা হলে ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের মুখপাত্র নাহিদ ইসলাম। শুরুতে সামান্য ও নিরীহ আন্দোলনই ছিল। অতীতে রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থীদের আরও বড় ও ব্যাপক আন্দোলন দমনের অভিজ্ঞতা থাকায় কোটা সংস্কারের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি সরকার।
১১ জুলাই পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না আসায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরদার হয়। এদিন হাইকোর্ট জানান, সরকার চাইলে কোটা পদ্ধতি পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে। এরপরও আন্দোলন-অবরোধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। সরকারের আহ্বান উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ হয়। রক্তাক্ত হয় অনেক শিক্ষার্থী। এতে গোটা দেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই উত্তাপে ঘি ঢালেন তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি লেলিয়ে দেন ছাত্রলীগকে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা হামলা চালায়। এতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। এরপরও সরকার চাইলে আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারত। তা না করে সরকারি বাহিনী দিয়ে ঘটানো হয় হত্যাকাণ্ড।
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ‘বুকের ভেতর বইছে ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগানে পুলিশের বন্দুকের সামনে প্রসারিত দুই হাতে সিনা টান করে দাঁড়ান। পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। একই দিন পুলিশের গুলিতে চট্টগ্রামে নিহত হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। ছাত্রলীগের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে জীবন দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত।
ভয়ের সংস্কৃতিকে পরাস্ত করতে ছাত্রদের পাশাপাশি রাজপথে নামতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ১৭ জুলাই শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে সব হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তা আর গ্রহণ করেনি ছাত্র-জনতা। সেদিন রাতে প্রথমে রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা এবং পরে যাত্রাবাড়ীতে লাখো মানুষ নেমে আসে সড়কে। সন্তানকে নিয়ে মা নামেন রাজপথে। কিশোরী কন্যার হাত ধরে বাবা নামেন। নারী ও শিশুদের নজিরবিহীন অংশগ্রহণ দেখা যায় তাতে।
পরদিন রাজধানীর উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরে ছড়ায় বিক্ষোভের আগুন। ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। ওই দিন অন্তত ৭৭ জনকে হত্যা করা হয়। হেলিকপ্টার থেকে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর গুলির অভিযোগও ওঠে ওই দিন।
১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশের মানুষ নেমে আসে রাজপথে। তাদের দাবি একটাই– শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হবে। ২১ জুলাই পর্যন্ত চার দিনে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়। নির্বিচার হত্যা ও গ্রেপ্তারে ২২ জুলাই থেকে ছাত্র-জনতা পিছু হটলেও ক্ষোভে আগুন আরও তীব্র হয়। শহর থেকে গ্রামেগঞ্জে ছড়ায় তা। ২৫ জুলাই ইন্টারনেট চালুর পর আগের হত্যা ও বর্বরতার ভিডিও-ছবি সামনে আসে। মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়ে। ২৬ জুলাই ফেনী থেকে আবার আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র-জনতা গুছিয়ে উঠে রাজধানীর উত্তরা থেকে ২ আগস্ট ফের রাজপথে নামে।
সেদিন কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, নোয়াখালীসহ প্রায় সব জেলায় বিক্ষোভ হয় সর্বস্তরের জনতার। নারী, নানা ধর্মের মানুষ, সব পেশার মানুষ সরকারের পতনের দাবি তোলে। পরদিন ৩ জুলাই জাতীয় শহীদ মিনার থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয় সরকার পতনের এক দফা। আওয়ামী লীগ আবারও দমনের পথ বেছে নেয়। ৪ আগস্ট ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৫০ জনকে হত্যা করা হয়। জনতাও রুখে দাঁড়ায়। নরসিংদীতে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা ছয় আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। রংপুরে গুলি করতে এসে নিহত হয় আওয়ামী লীগ নেতা। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে থানায় হামলা করে ১৫ পুলিশকে হত্যা করা হয়।
৪ আগস্ট রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা দেয়, পরদিনই হবে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। সেদিন রাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, জনতার মুখোমুখি হয়ে বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না। তার আত্মীয় এবং আওয়ামী লীগ নেতারা সেই রাতে দেশ ছাড়তে শুরু করেন। ৫ আগস্ট বেলা ১১টায় শহীদ মিনারে জমায়েত কর্মসূচি ছিল ছাত্র-জনতার। ভোর থেকেই শহীদ মিনারের দখল নেয় পুলিশ। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে নির্বিচার গুলি শুরু করে। সেদিন অন্তত ২৩ জন নিহত হয় চানখাঁর পুল ও শহীদ মিনার এলাকায়।
ততক্ষণে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুরে লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য গণভবন থেকে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করে বিচারের মুখোমুখি করা। দুপুর দেড়টার দিকে খবর আসে শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় থাকছেন না। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও দাঁড়ান জনতার পাশে। উল্লসিত জনতা গণভবনের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন থানা ঘেরাও করা জনতাকে সেই সময়েও নির্বিচার গুলি করে পুলিশ। জনতা বাধা পেরিয়ে ৩টার দিকে গণভবন পৌঁছায়। তবে তার আগে ২টা ৩৫ মিনিটে হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ক্রমান্বয়ে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি আসে ৫ আগস্ট তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণই ছিল এই সর্বাত্মক আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার এই স্বপ্ন সফল করতে জীবন দিতে হয়েছে হাজারো তরুণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে। আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। সরকারি গেজেট অনুযায়ী শহীদের সংখ্যা ৮৩৬ জন। এ ছাড়া সরকারি হিসাবেই আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ হাজার আন্দোলনকারী। হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসে নির্বাচিত সরকার।
মানবজাতির ইতিহাসে এমন গণজাগরণ বিরল—বাণীতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। বাণীতে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী হাজারো বীর শহীদ এবং পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি গভীর সম্মান ও সহমর্মিতা জানান তিনি। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন, বৈষম্য, সীমাহীন দুর্নীতি, শোষণ, গুম-খুন, দলীয়করণ; গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ এবং জেল-জুলুমের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অপ্রতিরোধ্য বহিঃপ্রকাশ।
ফলে কোটা সংস্কারের আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও নিরস্ত্র শিক্ষার্থী-জনতার ওপর নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে এই ঘনীভূত ক্ষোভ ও জনরোষ দ্রুত রূপ নেয় সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে। এই গণঅভ্যুত্থানে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষক, তরুণ-যুব সমাজ, রাজনৈতিক কর্মী; শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী মানুষ, অভিভাবক, ভ্রাতা-ভগ্নি, কন্যা-জায়া-জননী—সর্বস্তরের মানুষ অসীম সাহস ও ত্যাগের প্রতিজ্ঞা নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও সমবেত শক্তিতে রাজপথে নেমে আসেন। মানবজাতির ইতিহাসে এমন গণজাগরণ বিরল।
বাণীতে তিনি আরও বলেন, জনগণই সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস—গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই চিরন্তন সত্য ফের সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় আমাদের এমন একটি মানবিক ও গণমানুষের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আর কখনো ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার এবং উগ্রপন্থার ঠাঁই হবে না। বৈষম্য, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অন্যায়ের অবসান ঘটবে। যেখানে ভোটাধিকার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকার সমুন্নত থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন, জনস্বার্থ, জবাবদিহি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত হবে।
হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি—বাণীতে প্রধানমন্ত্রী: ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য ৫ আগস্ট আনন্দের দিন, বিজয়ের দিন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, এই দিনে দেশের বীর ছাত্র-জনতা এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। গণতন্ত্রকামী জনগণের সম্মিলিত আন্দোলনে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট গণভবন ছেড়ে পালিয়েছে। জাতীয় সংসদ ছেড়ে কথিত সংসদ সদস্যরা পালিয়েছে। আদালত ছেড়ে প্রধান বিচারপতি পালিয়েছে। বায়তুল মোকাররম ছেড়ে প্রধান খতিব পালিয়েছে। মন্ত্রিসভা ছেড়ে মন্ত্রীরা পালিয়েছে। ফ্যাসিবাদের দোসররা আত্মগোপনে চলে গেছে। ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও এক নজিরবিহীন ঘটনা।
তিনি বলেন, এ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে এবং বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেওয়া যাবে না।
লক্ষ্য অর্জনে শঙ্কার কথা জানালেন এনসিপি নেতা আখতার: জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি কালবেলাকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা কিছু জিনিস অর্জন করতে পেরেছি। ১৭ বছরের দুঃশাসন থেকে মুক্তি লাভ করেছি। বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার ফিরে আসছে। একটা স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের একটা সুযোগ আমরা পেয়েছি। এই গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের জন্যই আমরা রাষ্ট্রকাঠামোতে একটা ব্যাপক সংস্কার প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু সেই সংস্কারের বেশিরভাগ বিষয়ই বর্তমান সরকারি দল তারা এটাকে আমলে নিচ্ছে না। বরং সে বিষয়গুলো যখন সংসদে উপস্থাপন (প্লেস) করা হলো, তার অনেক কিছুই সংসদের বাইরে চলে গেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি যে কাঠামো, যেটা জনগণকে একটা অবিশ্বাসের মধ্যে ফেলে; সেই কাঠামোতে আমরা এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করিনি।
আখতার আরও বলেন, সচরাচর পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই দেখি যে, বড় বড় লক্ষ্য নিয়েই বড় ধরনের যুদ্ধ বা বিপ্লব-অভ্যুত্থানগুলো সংঘটিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে আমরা অর্জন করতে পারি না। একাত্তরেও আমাদের একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেক্ষেত্রে জুলাইয়ের যতদূর পর্যন্ত আমাদের প্রত্যাশা, তার কতটুকু আমরা অর্জন করতে পারব, সে ব্যাপারে আশঙ্কা আছে।
শঙ্কার মধ্যেও বহু অর্জন দেখছেন জামায়াত নেতা আযাদ: জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছুটা এগোলেও বিএনপি সরকারের সময় পিছিয়ে গেছে। অনেক রক্ত ও জীবন দেওয়ার মধ্য দিয়ে জুলাই অর্জন। প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। তবে মৌলিক কোনো অর্জন নেই।
তিনি বলেন, জনগণের যে ঐক্য হয়েছে এটা একটা অর্জন। মানুষ কথা বলার অধিকার পাচ্ছে, এটাও অর্জন। রাজনৈতিক দলগুলো এক সঙ্গে এক মঞ্চে বসে যে ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে এটা একটা অর্জন। তা ছাড়া জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে জুলাই সনদ তৈরি করতে পেরেছে, সেটার ওপর গণভোটও হয়েছে। এই যে বিষয়গুলো এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্ব সূচিত হয়েছে।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, আসলে এই অর্জনগুলোর কোনোটাই আমরা ধরে রাখতে পারব না এবং জাতি হিসেবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-অগ্রগতিও আমরা অর্জন করতে পারব না, যদি না সংস্কারের মাধ্যমে সিস্টেমের পরিবর্তন আসে। এটা জুলাই গণভোটে বলা হয়েছে। সংস্কার না হলে বিগত দিনের কালিমামুক্ত যেমন করা যাবে না, তেমনই জুলাইকেও স্থায়ীভাবে টেকসই করা যাবে না। সরকার যদি সংবিধান সংশোধনের পথে না গিয়ে সংস্কারের পথে যেত, তা হলে এটা আমরা অর্জন করতে পারতাম।
দেয়ালের গ্রাফিতিতে গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা—আনু মুহাম্মদ: লেখক ও গবেষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে যেভাবে সবাই সজাগ হয়ে উঠলেন–তার মধ্য দিয়ে একটি আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়। সেটি হলো এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা স্বৈরতন্ত্রকে রক্ষা করবে না; বরং গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, নিপীড়নমুক্ত ও আধিপত্য থেকে মুক্ত হবে। যার ফলে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। এই প্রত্যাশাগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা আকারে না থাকলেও দেয়ালের গ্রাফিতির মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। দেয়ালের গ্রাফিতি আমাদের এই গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা।
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা যেগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো তো কোনো জমাটবাঁধা রূপ নেয়নি। শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালিয়েছেন, যেভাবে নিপীড়ন বা দমন-পীড়ন চলেছে, সেভাবে যেন আর না চলে–তা খুব বড় কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাগুলো প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। শুরু থেকেই গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করে সহিংসতা, নৈরাজ্য, লুটপাট, আক্রমণ, ভাঙচুর, মব সন্ত্রাস দেখা যায়। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক জগতের ওপর আক্রমণ বেড়ে যায়। গান, বাউল, মাজার, ছবি আঁকা, নাচ, নাটক, ভাস্কর্য, থিয়েটার, চলচ্চিত্র–বাংলাদেশের মানুষের যত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি রয়েছে, তার প্রতিটি আক্রান্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নের ওপরও আক্রমণ হয়েছে। এই ঘটনাগুলো তো নিশ্চিতভাবে গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল না।
আশার কথা শোনালেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে আমি মনে করি, বিগত ১৭ বছর তো একটা ফ্যাসিস্ট, তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের মধ্যে ছিলাম। এটাতে গণতন্ত্রের লেশমাত্র ছিল না। গণবিস্ফোরণেরর মাধ্যমে মূলত গণসম্পৃক্ততা ছিল এই আন্দোলনে। আসলে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অন্যায় অবিচার এগুলোর প্রতি বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই কিন্তু ৫ আগস্ট ঘটেছে। তারপর সেটার মূল চেতনা ছিল আমরা একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ— যেমন যেখানে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারব, মিছিল-মিটিং করতে পারব; শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে; সংসদ প্রাণবন্ত হবে।
তিনি বলেন, জুলাই চেতনার মূল যে স্পিরিটটা— আমরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে থাকব; সরকারের জবাবদিহি করতে হবে, সেটাতে আশাবাদী। ইতোমধ্যে সংবিধানের যে সংস্কার করার জন্য কমিশন, সেখানে বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটার কার্যক্রম তো শুরু হতে যাচ্ছে। যে বিষয়গুলো নিয়ে মতপার্থক্য আছে, আমরা আশাবাদী এগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে আগামী দিনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে।