Image description

চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার, টোল ওঠানো কিংবা ট্র্যাকিং। এসব ক্ষেত্রে নিখুঁত সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১২ সালে ডিজিটাল নম্বর প্লেট চালু করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে অর্ধকোটির বেশি যানবাহন মালিকের কাছ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করেছে সংস্থাটি। তবে প্রায় ১৪ বছরেও প্রতিশ্রুত সেবা মেলেনি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না বানিয়ে শুধু নম্বর প্লেট বিক্রি করা হয়েছে।

আগের প্রকল্পের এমন ব্যর্থতার মধ্যেই ১ আগস্ট থেকে নতুন করে গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

যেভাবে শুরু

২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে সব ধরনের যানবাহনের জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট বাধ্যতামূলক করে বিআরটিএ। তখন বলা হয়েছিল, ডিজিটাল নম্বর প্লেট সংযুক্ত গাড়ি চুরি হয়ে গেলে তা ট্র্যাকিং করে খুঁজে বের করা যাবে। কোনো অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার হলে সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে টোল আদায়ও স্মার্ট সিস্টেমে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

তখন দৃশ্যমান নম্বর প্লেট এবং গাড়ির কাচে লাগানোর ইলেকট্রনিক চিপ—রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) ট্যাগের ফি নির্ধারণ করা হয়। মোটরসাইকেল ও তিন চাকার বাহনের জন্য দুই হাজার ২৬০ টাকা আর চার চাকার বাহনের জন্য চার হাজার ৬২৮ টাকা ধরা হয়।

হাজার কোটির রাজস্ব, সেবা শূন্য

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য মোট ৫৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৯টি আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেট সরবরাহ করা হয়েছে। একই সময়ে যানবাহন মালিকরা তাদের গাড়িতে ৪৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৯টি নম্বর প্লেট সংযোজন করেছেন। বিভিন্ন সার্কেল অফিসে পড়ে আছে ৫ লাখ ৬২০টি ডিজিটাল নম্বর প্লেট, যা যানবাহন মালিকরা সংগ্রহ করে গাড়িতে সংযোজন করেননি।

এসব নম্বর প্লেটের বিনিময়ে যানবাহন মালিকদের কাছ থেকে বিআরটিএ আদায় করেছে এক হাজার ৫১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৪টি ভারী যানবাহন থেকে আদায় হয়েছে ১১৫ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ২৩২ টাকা।

৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৮৭টি হালকা ও মধ্যম যান থেকে আদায় হয়েছে ৪৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫২ হাজার ২৩৬ টাকা। এ ছাড়া ৪২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫৮টি মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার থেকে আদায় হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৪১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

ডিজিটাল নম্বর প্লেট নিয়ে বিআরটিএর পক্ষ থেকে বলা সুবিধাগুলোর ন্যূনতম কোনোটিই পাননি গাড়ির মালিকরা। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি ছয়জন ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক এবং আটজন মোটরসাইকেল মালিকের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তাদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি কেউই জানেন না ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগের কাজ কী।

পুরানা পল্টন মোড়ে কথা হয় মোটরসাইকেল মালিক হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গাড়ি কিনলে সঙ্গে ডিজিটাল নম্বর প্লেট কিনতে হয়। এটা রেজিস্ট্রেশনের অংশ।’ প্রায় একই ধরনের উত্তর দিয়েছেন অন্যরাও।

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক শুব্রত মন্ডল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার বাইক চুরি হয়ে যাওয়ার পর জিডি করেছি। প্রথম প্রথম কয়েক বার থানায়ও গিয়েছি। পুলিশ বলেছে ধৈর্য ধরতে। এখনও পাইনি। আট মাসের বেশি হয়েছে, তাই আশা ছেড়ে দিয়েছি।’ চোরাই গাড়ি উদ্ধার যে ডিজিটাল নম্বর প্লেটের অন্যতম উদ্দেশ্য, তা জানা নেই এই চিকিৎসকের।

বিপুল অর্থ খরচের পরও দেশের সড়ক-মহাসড়কে চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত করার মতো ন্যূনতম অবকাঠামো গড়ে তোলেনি বিআরটিএ। প্রাথমিক অবস্থায় সারা দেশে ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানোর কথা থাকলেও চলতি বছরের ২৯ জুলাই পর্যন্ত বসানো হয়েছে মাত্র ১২টি। এর সবগুলোই ঢাকা শহরের মধ্যে। চেকপোস্টগুলো পর্যবেক্ষণের জন্যও আলাদা করে জনবল বসাতে পারেনি বিআরটিএ।

মূল পরিকল্পনায় যা ছিল

গাড়িকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও স্মার্ট ট্র্যাকিংয়ের উদ্দেশ্যে ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ প্রকল্প শুরু হয়। এই প্লেট-ট্যাগ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫ বছরের চুক্তি করা হয় বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সঙ্গে।

মোটরসাইকেল বা তিন চাকার বাহনের প্রতি প্লেটের জন্য ১ হাজার ৮০৫ টাকা এবং চার চাকার বাহনের জন্য ৩ হাজার ৬৫২ টাকা দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরএফআইডির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের হালনাগাদ তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়ার কথা ছিল। প্লেটগুলো রাতে ৪০ ফুট দূর থেকেও দৃশ্যমান হওয়ার কথা। অন্যদিকে ১১ মিটার দূর থেকে চিপ স্ক্যান করে গাড়ির গতিপথ জানা যাবে বলে বলা হয়েছিল। এই তথ্যের মাধ্যমে বিআরটিএ সার্ভারের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি সংযোগ স্থাপনের কথা ছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়হীনতা

১৪ বছরেও বিআরটিএর সেন্ট্রাল সার্ভারের সঙ্গে পুলিশের ডিজিটাল সংযোগ না থাকায় আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে না পুলিশ। ফলে শুধু গত জুলাইয়ে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৬০ হাজারের বেশি মামলা এবং জুনে ৩২টি গাড়ি চুরির ঘটনা পুলিশকে নিজস্ব সোর্স ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সামাল দিতে হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নিয়াজ মেহেদী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আরএফআইডি প্রযুক্তি না থাকায় পুলিশ নিজস্ব প্রযুক্তি ও সোর্স ব্যবহার করে অপরাধ দমন এবং চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধার করে। বিআরটিএর মাসিক প্রতিবেদন থেকে শুধু ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা যায়।’

বাধ্যতামূলক জিপিএস ট্র্যাকার

ডিজিটাল নম্বর প্লেটে ব্যর্থতার পর এখন নতুন করে গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো বাধ্যতামূলক করেছে বিআরটিএ। নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গত ১১ জুন এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনে জিপিএস ডিভাইস সংযোজন ও সচল রাখা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়।

সংস্থাটি জানায়, জিপিএস ডিভাইসের কারিগরি স্পেসিফিকেশন বিআরটিএর স্থানীয় কার্যালয় বা সংস্থার ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা যাবে। গণপরিবহনে জিপিএস সংযুক্ত ও সচল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ প্রদান বা নবায়ন করা হবে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পরিবহন মালিক ও প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে বিআরটিএ।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

বিআরটিএর উপপরিচালক ফারুক হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত ১৪ বছরে আমরা প্রায় অর্ধকোটি যানবাহনে ডিজিটাল নম্বর প্লেট সংযোজন করতে পেরেছি। দীর্ঘ এ সময়ে কাজের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়েছে, সাধারণ মানুষ এখন থেকে এর সুফল পেতে শুরু করবে। বর্তমানে ১২টি চেকপোস্ট সচল রয়েছে, তবে নানা কারণে নতুন করে আর চেকপোস্ট বসানো সম্ভব হয়নি।’

চেকপোস্টের জন্য সুনির্দিষ্ট জনবল না থাকার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের জনবল সংকট। এই জনবল দিয়ে সার্ভার মনিটরিংয়ের কাজও করিয়ে নিচ্ছি।’

বিএমটিএফের ডিজিটাল নম্বর প্লেট বিভাগের প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মেজর রেজাউল ইসলাম। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এটার সঙ্গে আরও অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। সবাই সবার দায়িত্ব পালন করলে জনগণ সেবা পেতে বাধ্য। বিএমটিএফ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে। সঠিক সময়ে আমরা ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং আরএফআইডি মেশিন সরবরাহ করছি।’

আরএফআইডির ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ

পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভালো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং আরএফআইডি ট্যাগ বসানো হয়েছিল। কিন্তু মানুষ সেবা পায়নি। যেমন: সেতুগুলোতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল দেওয়ার ব্যবস্থা। এখানে আরএফআইডি ট্যাগ বসানো হলেও যেখানে টোল দেওয়া প্রয়োজন সেখানে আরএফআইডি রিডার বসানো হয়নি। ফলে মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রথম দিকে যেসব আরএফআইডি ট্যাগ বসানো হয়েছিল এর বেশিরভাগই হয়তো এখন অকার্যকর। প্রত্যেক যানবাহন মালিক ডিজিটাল নম্বর প্লেটের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে আরএফআইডি ট্র্যাকার কিনেছে, কিন্তু এর কোনো সেবা মানুষ পায়নি।’

তিনি বলেন, ‘সরকার এখন গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানোর যে নির্দেশনা দিয়েছে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ যানবাহনের যাবতীয় তথ্যের সুরক্ষা এবং জিপিএস ট্র্যাকার লাগানোর মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অনেক বেশি আন্তরিক হতে হবে। অন্যথায় এটাও আরএফআইডির ট্যাগের মতো অবস্থা হবে।’