রাজধানীর সন্নিকটে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গড়ে ওঠা ‘পূর্বায়ন প্রপার্টিজ লিমিটেড’ (সাবেক ফামাক সিটি) নামের এক আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে বেপরোয়া জমি দখল, অনিয়ম ও নৈরাজ্যের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম অনুমোদন বা নকশার ছাড়পত্র ছাড়াই আবাসন প্রকল্পের নামে স্থানীয়দের শত শত বিঘা জমি দখল করেছে প্রতিষ্ঠানটি। জোরপূর্বক কৃষকদের ফসলি জমিতে বালু ভরাট, ফসল বিনষ্ট করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির মাধ্যমে রূপগঞ্জ এলাকাকে এক ধরনের জিম্মি করে রেখেছে তারা। প্রভাবশালীদের এ আগ্রাসনের সামনে একরকম অসহায় পুরো এলাকার কৃষিনির্ভর লোকজন। বাপ-দাদার জমি আবাসন কোম্পানি দখলে নেওয়ায় পথে বসার উপক্রম তাদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় একাধিক অভিযোগ, এমনকি জমি রক্ষায় মানববন্ধন করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও অপরাধের ইতিহাস: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ প্রতিষ্ঠানটি ‘ফামাক সিটি’ নামে তাদের যাবতীয় জবরদখল ও বেআইনি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পটপরিবর্তনের পরে এ প্রতিষ্ঠানটিতে ঊর্ধ্বতন পদে রদবদল হয়। নিজেদের অপরাধ, বেআইনি দখলদারিত্ব ও অপরাধমূলক ইতিহাস আড়াল করার কৌশল হিসেবে রাতারাতি প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পূর্বায়ন সিটি’ বা ‘পূর্বায়ন প্রপার্টিজ লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল পদেও আসে বেশ কিছু রদবদল। নাম বদলালেও তাদের কাজের ধারায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি, বরং আরও বেশি বেপরোয়া গতিতে তারা স্থানীয় নিরীহ মানুষের জমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
জানা গেছে, আবাসন কোম্পানিটির বর্তমান চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন আহমেদ একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি। জালিয়াতি ও নানা অপকর্মের কারণে এর আগে তিনি জেলও খেটেছেন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে বেআইনিভাবে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুয়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চক্রটি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। আবাসিক এলাকায় অবৈধ কারখানা ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সংকট: আবাসন খাতের প্রচলিত আইন ও সরকারের নগর উন্নয়ন নীতিমালা অনুযায়ী, যে কোনো আবাসিক প্রকল্পের অভ্যন্তরে কোনো ভারী শিল্প বা পরিবেশ দূষণকারী শিল্প কারখানা স্থাপন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। অথচ ‘পূর্বায়ন সিটি’ তাদের প্রস্তাবিত আবাসিক প্রকল্পের ভেতরের জমিতে বেআইনিভাবে তৈরি করেছে বিশাল পোশাক ও জুতা তৈরির কারখানা।
একদিকে আবাসন প্রকল্পের কথা বলে প্লট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সেই আবাসিক এলাকাতেই রাসায়নিক বর্জ্য ও দূষণ ছড়ানো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি নিচু ভূমি ও কৃত্রিমভাবে বালু ভরাটের ফলে মারাত্মক সংকটে পড়েছে স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ। কোনো ধরনের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) ছাড়া খালের গতিপথ বন্ধ করে ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করে বালু ফেলার কারণে রূপগঞ্জের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বছরের পর বছর ধরে কৃষকদের কষ্টে গড়ে ওঠা উর্বর জমিগুলো আজ বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকছে, যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাতের আঁধারে বালু ভরাট ও শত শত বিঘা জমি গ্রাস: স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো জমি ক্রয় বা বায়নাপত্র না করেই প্রতিষ্ঠানটি রূপগঞ্জের ভোলাবো ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গুতিয়া এলাকার জমি দখলের উদ্দেশ্যে পলাশ হোসেন নামে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়। পলাশ হোসেন ও তার বাহিনী কোনো ধরনের আইনি তোয়াক্কা না করে স্থানীয় ছনপাড়া-চান টেক্সটাইল সড়ক কেটে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে বালু ভরাট শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, পলাশের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়মিত রাতের আঁধারে গিয়ে কৃষকদের জমিতে সরাসরি বালু ফেলা শুরু করে। রাতের বেলা ফেলা বালুর পানি চারপাশের জমিতে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের শত শত বিঘা জমির উঠতি ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ৮০ থেকে ১০০ বিঘা কৃষিজমি সরাসরি বালুর নিচে চাপা পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিনুর আক্তার। যার ৯০ শতক জমি দখলে নিয়েছে পূর্বায়ন সিটি। শাহিনুর আক্তার কালবেলাকে বলেন, ‘আমার প্রায় ৩ গন্ডা বা ৯০ শতক জমি বালু ফেলে জোর করে দখলে নিয়েছে। আমার জমির ওপর দিয়ে ওরা প্রজেক্টের রাস্তা বানিয়েছে। জমিতে ফসল থাকা অবস্থায় বালু ফেলে ভরাট করেছে ফেলেছে। আমার জমিতে ওরা গেট বানিয়েছে। আমি প্রতিবাদ করলে আমাকে মেরে গুম করে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ দিলে পুলিশ অভিযোগ নেয় না। ওসি বলে— কোম্পানির সঙ্গে তো আপনি পারবেন না, মিলমিশ করে নেন।’
ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী মাহফুজুর রহমানের ৫৫ শতক জমি জোর করে বালু ভরাট করে দখলে নিয়েছে হাউজিং কোম্পানিটি। জানতে চাইলে মাহফুজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের তিনজনের ৫৫ শতক জমি বালু ফেলে দখলে নেওয়া হয়েছে। আমরা পরে জমি বিক্রি করতে গেছি— তারা কিনবেও না আর আমাদের জমি ছাড়বেও না। পরে আমি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে রেখেছি। এখন স্থানীয়দের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা চলছে।’
এই শাহিনুর কিংবা আইনজীবী মাহফুজুর রহমানই নন; এমন শত শত ভুক্তভোগী রয়েছেন, যারা পূর্বায়ন প্রপার্টিজ লিমিটেডের আগ্রাসনে নিঃস্ব হয়েছেন। জমি ও ফসল হারিয়ে নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী কৃষকরা একত্রিত হয়ে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাব কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে একাধিক কৃষক কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং নিজেদের সহায়-সম্বল হারানোর করুণ বিবরণ তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় কৃষক কামরুল হাসান (ওরফে রিপন মাস্টার) জানান, তার প্রায় ৭ বিঘা জমির ফসল বালুর পানিতে তলিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। জমি হারিয়ে তিনি চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ও ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়—রিপন মাস্টারের ৭ বিঘা জমির রোপণ করা ফসল সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মাসুম মোল্লার ২ বিঘা জমি কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়া জোরপূর্বক বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। সজীব মিয়ার ৩ বিঘা জমিতে ফলানো চলতি মৌসুমের সব ফসল পানিতে তলিয়ে বিনষ্ট। তোফাজ্জল মোক্তারের পৌনে ৩ বিঘা জমিতে জোরপূর্বক জবরদখল। রেনু মিয়ার আড়াই বিঘা ফসলি জমি বালু ভরাটের শিকার। আবু তাহেরের দেড় বিঘা জমির ফসল ধ্বংস। ফজর আলীর ৪০ শতাংশ জমি দখল। আনোয়ার আলী মোল্লার ৫৬ শতাংশ জমিতে অবৈধ বালু ভরাট। মিলন মিয়ার ১ বিঘা জমি জবরদখল। আব্দুর রাজ্জাকের ৭ শতাংশ জমির মালিকানা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। আনিস মিয়ার ৫ শতাংশ জমিতে বালু ফেলে বেড়া নির্মাণ। এ ছাড়া শাহিনুরের ৯০ শতাংশ, বাচ্চু মিয়ার ৬০ শতাংশ মাহফুজুর রহমানের ৫৫ শতাংশ, রিয়াজ খান চৌধুরীর ১৫ শতাংশ ও তোফাজ্জল মোক্তারের ৭০ শতাংশ জমি পূর্বায়ন সিটির আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা বংশপরম্পরায় কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু এভাবে যদি দিনদুপুরে শত শত বিঘা জমি দখল হয়ে যায় এবং ফসলি জমি বালুর নিচে চাপা পড়ে, তবে পুরো এলাকাতে চরম খাদ্য সংকট ও বেকারত্ব দেখা দেবে।
প্রতিবাদ করলেই জোটে চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা: শাহিনুর আক্তার নিজের ৯০ শতাংশ জমি হারিয়ে পাগলপ্রায়। নিজের ফসলি জমিতে বালু ভরাটের সময় বাধা দেন। এ কারণে তাকে চাঁদাবাজ বানিয়ে রূপগঞ্জ থানায় মিথ্যা মামলা দায়ের করে আবাসন কোম্পানিটি। শুধু শাহিনুরই নন; যারাই তাদের জমি রক্ষা করতে গেছেন, তাদের নামেই দেওয়া হয়েছে মিথ্যা মামলা। কোনো কৃষক নিজের জমিতে বালু ফেলতে বাধা দিলে বা প্রতিবাদ সভার আয়োজন করলে আবাসন কর্তৃপক্ষের অস্ত্রধারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরাসরি হুমকি দেন। কোম্পানিটি উল্টো রূপগঞ্জ থানায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিরীহ কৃষকদের বিরুদ্ধেই মোটা অঙ্কের ‘চাঁদাবাজি’ ও ‘কাজে বাধা দেওয়ার’ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করছে। থানা পুলিশ দিয়ে হয়রানি করিয়ে অনেক কৃষককে বাড়িছাড়া করা হয়েছে। জমি হারিয়ে, ফসল হারিয়ে এবং পুলিশের ভয়ে আজ বহু কৃষক পরিবার পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, আমাদের জমি কাড়ল, ফসল মারল, আবার আমাদের নামেই মামলা দিল! আমরা এখন কার কাছে বিচার চাইব।
আশু সমাধান ও সাধারণ মানুষের আকুল আবেদন: রূপগঞ্জকে সম্পূর্ণরূপে মরুভূমি ও আধুনিক দাসত্বে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে অবিলম্বে সমন্বিত সরকারি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজ। স্থানীয় অধিবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে বালু ভরাট বন্ধ; অবৈধ কারখানা উচ্ছেদ; জমির পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনা; মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা।
অভিযোগ অস্বীকার কোম্পানির চেয়ারম্যানের: অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বায়ন প্রপার্টিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা কারও জমি দখল করিনি। টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করেছি। কারও জমিতে বালু পড়লে তাদের টাকা দিয়ে দেওয়া হয়। কেউ যদি টাকা না পায়, তাহলে আমাদের কাছে আসতে বলেন—আমরা টাকা দিয়ে দেব।’ স্থানীয়দের হয়রানির বিষয়টি তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার কারও নামে মামলা করিনি বা কাউকে হয়রানিও করছি না।’