Image description

‘এই কবরগুলোতে যারা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন, তাদের সবার পিতৃপরিচয় ছিল, ছিল তাদের পরিবার। কিন্তু স্বৈরাচার সরকারের কারণে তারা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়েছেন। তারা তো বেওয়ারিশ ছিলেন না।’ রায়েরবাজার কবরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকের ৩৭ নম্বর লাইনের একটি কবরের সামনে ঝুলছে এমন হৃদয় বিদারক সাইনবোর্ড। এ ব্লকের সারি সারি কবরে শুয়ে আছেন স্বৈরাচার সরকারের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো সব সাহসী সন্তান।

নিহতের দুই বছর পরেও রায়েরবাজার কবরস্থানের ১০৬টি কবর আজও অচেনা, নামহীন। কারও জানা নেই, তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তান, ভাই বা স্বামীর শেষ ঠিকানা এখানেই কি না। পরিচয় না পাওয়ায় আজও তারা থেকে গেছেন একেকটি সংখ্যা হয়ে। আর বীর সন্তানদের যারা বেওয়ারিশ লাশে পরিণত করল সেইসব আসামিদের বেশির ভাগই আজও পলাতক। তাদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর তো দূরের কথা, অনেকের অবস্থানই শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পলাতকদের বড় অংশই সাবেক পুলিশ সদস্য। এমনকি, সাজাপ্রাপ্ত ৬১ জনের মধ্যে ৩৪ জনই পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্য।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল ১১৪টি লাশ। এখন পর্যন্ত পরিচয় মিলেছে মাত্র আটজনের। কবরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকে সারি সারি কবর। প্রতিটির সামনে একটি করে বাঁশের খুঁটি। দেড় বছর পর, ডিএনএ পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত পরিচয় মিলেছে মাত্র আটজনের। রায়েরবাজার কবরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকের ৩৭ নম্বর লাইনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কয়েকটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। লাশগুলো কবর দেওয়ার সময় কবরস্থান কর্তৃপক্ষ প্রতিটি কবরের সামনে একটি করে বাঁশের খুঁটি পুঁতে দিয়েছিল। ঝড়বৃষ্টিতে অনেক কবরের বাঁশের খুঁটি এবং নম্বর সরে গেছে, কোথাও কোথাও নষ্ট হয়ে গেছে। অবশ্য ডিএনসিসির তত্ত্বাবধানে বর্তমানে কবরগুলো ঘিরে ইটের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।

জানা যায়, যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৮) নিখোঁজ হন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। ভাই আলভীর হাতে আসা একটি ভিডিওতে এক শিশুর রক্তাক্ত দেহের পাশে নিথর পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। এরপর হাসপাতাল-থানা ঘুরে, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নথির সঙ্গে ছবি মিলিয়ে ৩৪ দিন পর সন্ধান মেলে। তিনিও রায়েরবাজারে ছিলেন বেওয়ারিশ হিসেবে। তার মা রাশেদা বেগমের ডিএনএ পরীক্ষার পর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে।

এ পর্যন্ত রায়েরবাজারে শনাক্ত হওয়া আট শহীদ হলেন- মাহিন মিয়া, রফিকুল ইসলাম (পিতা খোরশেদ আলম), আসাদুল্লাহ, রফিকুল ইসলাম (পিতা- মৃত আবদুল জব্বার শিকদার), সোহেল রানা, ফয়সাল সরকার, কাবিল হোসেন ও পারভেজ বেপারী। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত বছরের ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় ও আন্তর্জাতিক মিনেসোটা প্রোটোকল অনুসরণ করে রায়েরবাজার থেকে ১১৪টি লাশ তুলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। 

সংস্থাটি তথ্যানুযায়ী, ১০৬টি লাশের কোনো দাবিদার এখনো পাওয়া যায়নি, কেউ যোগাযোগও করেননি। যদিও প্রতিটি নমুনা ফরেনসিক ল্যাবে সংরক্ষিত আছে। রায়েরবাজার কবরস্থানের পরিচর্যার কাজে যুক্ত মোজাহারুল ইসলাম বলেন, আগে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অনেকে আসতেন, এখন শুধু শনাক্ত হওয়া আটজনের পরিবারই কবর জিয়ারতে আসে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম রায়েরবাজার কবরস্থানে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ৮০ জনের এবং আগস্টে ৩৪ জনের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে। 

নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা করার একমাত্র সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ‘ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি’। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব জানান, এখন পর্যন্ত ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। বাকি ১০৬টি লাশের জন্য আর কোনো দাবিদার আসেননি। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন বলেন, ৮ জনের জন্য ১১ জন স্বজন নমুনা দিয়েছিলেন। আর বাকিদের জন্য এখনো আর কেউ আসেননি। যদি কেউ ল্যাবরেটরিতে আসেন আমরা নমুনা সংগ্রহ করব।

সাজাপ্রাপ্ত ৬১ আসামির ৪১ জনই পলাতক

চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময়ের বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একের পর এক রায় দিচ্ছেন। দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬ মামলায় ৬১ জনকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দণ্ডিত ৪১ আসামিই পলাতক। তাদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর তো দূরের কথা, অনেকের অবস্থানই শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পলাতকদের বড় অংশই সাবেক পুলিশ সদস্য। এমনকি, সাজাপ্রাপ্ত ৬১ জনের মধ্যে ৩৪ জনই পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্য।

ট্রাইব্যুনাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই অনেকটা আত্মগোপনে চলে যান দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। পর্যায়ক্রমে তাদের বেশির ভাগই দেশ ছাড়েন। ফলে ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরুর পর তাদের হদিস পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে পুলিশ আসামিদের মধ্যে কয়েকজনকে দায়িত্বপালন অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হলেও অধিকাংশকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। 

ফলে রায় হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বলেছে, রায়ের পর দণ্ডিত আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারের ওপর। সেখানে ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত দণ্ডিতদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, আসামিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায়ে ৬১ জন বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হয়েছেন। 

এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে তিন মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জন দণ্ডিত হয়েছেন। এই তিন মামলায় পলাতক আসামি ১০ জন। অন্যদিকে তিন মামলার রায়ে ৪৬ জনকে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর মধ্যে পলাতক রয়েছেন ৩২ আসামি। দুই ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে পলাতক আসামি ৪২ জন হলেও ডিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান একাই দুই মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন।

 পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। তবে, দণ্ডিত ৬১ আসামির ৩৪ জনই পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্য। জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৫৯০টি অভিযোগ গ্রহণের পর যাচাইবাছাই করে ১০৯টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে যেগুলোর তদন্ত শেষ হয়েছে সেগুলোর বিচার চলছে। সবমিলিয়ে ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। কয়েকটির বিচার চলছে। শিগগিরই আরও মামলা বিচারের জন্য আসবে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিচার চলাকালে আসামি গ্রেপ্তারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার ওপরও থাকে। আমরা তদন্তাধীন অবস্থায় মাঝে মাঝেই অনেক আসামি গ্রেপ্তার করি। কিন্তু রায়ের পর বিষয়টি সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চলে যায়। 

তাই আমাদের পক্ষে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সাজাপ্রাপ্ত পলাতকদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। তাদের খুঁজে বের করতে সেগুলো পাঠানো হয়েছে স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায়। এদের কেউ কেউ অবৈধপথে বিদেশে চলে গেছেন। তাই তাদের অবস্থান শনাক্ত করা একটু কঠিন হচ্ছে। তবে পুলিশ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ছয় মামলায় ৬২ জনের সাজা : গণ অভ্যুত্থানের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। এ ছাড়া, রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১।

এ মামলার আরও পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদাণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন ও একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১। অপরদিকে, সাভারের আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যা ও লাশ পোড়ানো মামলায় ৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এ মামলায় সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

রাজসাক্ষী হওয়ায় আবজালুর রহমানকে ক্ষমা করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের মামলায় সাবেক দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন একই ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ের অপেক্ষায় এক মামলা : কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ চার আসামির রায় যেকোনো দিন ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে করা মামলাটি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে রয়েছে।