কয়েকদফা দিন ঘোষণার পর অবশেষে খুলছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। বুধবার সকাল ৯ টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটি উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পর এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। গতকাল সরজমিন দেখা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের দিন ধার্য হলেও এখনো এর পুরো কাজ সমাপ্ত হয়নি। বাকি কাজ শেষ করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। একই সঙ্গে কাজ চলছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরেও। কালো রডে ঘেরা নতুন প্রবেশ গেটের পাশে ফাঁকা জায়গায় সাদা তাঁবু টাঙিয়ে তৈরি করা হচ্ছে উদ্বোধনী মঞ্চ। মঞ্চের সামনে করা হচ্ছে আগত অতিথিদের বসার জায়গা। আর এসব কাজের জন্য নেয়া হয়েছে অতিরিক্ত শ্রমিকও।
বিশেষায়িত এই জাদুঘরটির প্রতিটি কোণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে- গত ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের নির্যাতন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের নানা স্মৃতিচিহ্ন ও দালিলিক প্রমাণ দিয়ে। প্রবেশ পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়- লম্বা সাদা পাথরের ওপর আঁকা হয়েছে পুরো জাদুঘরের ভেতরে কোথায় কী আছে তার পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ। পার্কিং, স্মারক বিবরণী, বহির্গমন, জুলাই মঞ্চ, মেমোরিয়াল, প্রতীকী আয়নাঘর, পাবলিক টয়লেট, থিয়েটার কোথায় কী রয়েছে তা সব ওই ম্যাপে চিহ্নসহ উল্লেখ করা রয়েছে। যে কেউ সহজেই এই ম্যাপ দেখে জাদুঘর সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাবে। জাদুঘরের ভেতরে সবুজ ঘাস দিয়ে উন্মুক্ত জায়গায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তৈরি করা হয়েছে সারি সারি প্রতীকী কবর। আর এই কবরের সামনে সাদা পাথরের নাম ফলকে খোদাই করে লেখা হয়েছে জুলাই আন্দোলনে শহীদের নাম।
এছাড়াও জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি, তথ্য সংযুক্ত করে পুরো জাদুঘরের মাঠ ও চলাচলের রাস্তার পাশে সাইনবোর্ডের মতো ব্যানার তৈরি করা হয়েছে। আছে পানির ফোয়ারাও। আন্দোলনে সেøাগান দেয়া জুলাই যোদ্ধার প্রতিকৃতিও আছে এর মধ্যে। তাদের চারপাশে আছে অগণিত প্রতীকী হাত। শুধু জুলাই নয়, ১৯৮২ সালে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যোগ দেয়া থেকে শুরু করে ১৯৮৬ এর নির্বাচনে গণতন্ত্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বেঈমানি, ১৯৯১ এ সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা, ২০০৬ এ লগি- বৈঠার তাণ্ডব, ১/১১ এর সময়ের নানা ঘটনার ছবি ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময়ে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বিভিন্ন ছবিও তথ্যসহ রাখা আছে।
গণভবনের লাল দেয়ালে রঙ-তুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে বুয়েটের আবরার ফাহাদ থেকে শুরু করে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের গ্রাফিতি। বাইরের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত গণভবনের ভেতরেও বিভিন্ন চিত্রের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শয়নকক্ষ, আলমারি, পালঙ্ক (খাট), বালিশ, ক্ষতিগস্ত আসবাবপত্র, দেয়াল সবকিছুই আলাদা করে রুপ দেয়া হয়েছে। খাটে বিছানো হয়েছে সাদা চাদর, যেখানে লেখা রয়েছে আন্দোলনে শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের নাম। তৈরি করা হয়েছে প্রতীকী আয়নাঘর।
টর্চার সেল। সেখানে রাখা হয়েছে আয়নাঘরে ব্যবহৃত ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার বিশেষ চেয়ার। আলাদা তাকে সাজানো হয়েছে ছাত্রদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আকৃতির পানি খাওয়া বোতল। কোনোটাতে আবার আঁকা হয়েছে মীর মুগ্ধের ছবি। পত্রিকার কাটিং, ছবি, লেখা সংবলিত বিভিন্ন তথ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের ‘বিচার ব্যবস্থা’ নিয়েও তৈরি করা হয়েছে আলাদা কর্নার। আছে বিশেষ লাল টেলিফোন। জুলাই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী উল্লেখ করে সাবেক সিটি মেয়র ফজলে নূর তাপসের ছবি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আলাদা লাল গ্লোব।
শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে জুলাইয়ে রক্তাক্ত পাঞ্জাবি, গুলিবিদ্ধ জুলাইযোদ্ধা, রাস্তায় সেজদা দেয়ার ছবি সবই বাঁধাই করে রাখা হয়েছে জুলাই জাদুঘরে। ছবির পাশাপাশি ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তৈরি করা হয়েছে আলাদা ভিডিও গ্যালারি। যেখানে বসে সহজেই দেখা যাবে ৩৬ জুলাই আন্দোলনের তৎকালীন চিত্র। এ ছাড়াও আরও অনেক কিছু রয়েছে এই জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে। জাদুঘরের ভেতরে মানুষের চলাচলের জন্যও তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা। গাড়ি, মোটরসাইকেল কোন দিক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে, পার্কিং হবে এমনকি হুইল চেয়ার থেকে কোন জায়গায় নামতে হবে সেসব উল্লেখ করেও ছবিযুক্ত দিকনির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।
এতদিন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও উদ্বোধনের আগ দিয়ে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যুগ্মসচিব ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
জুলাই জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা মানুষের সামনে তুলে ধরতেই জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা ধারণ করেই এই জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ স্বৈরশাসক হতে চাইলে এই জাদুঘর তাদের জন্য শিক্ষণীয় হবে। সাংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, যদি ভবিষ্যতে কোনো শাসক আবার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চান, তাহলে এই জাদুঘর তাকে মনে করিয়ে দেবে যে জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং জনগণের প্রতিরোধের মুখে স্বৈরশাসনের পতন অনিবার্য।
তিনি বলেন, একসময় যে ভবন ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, সেটিই এখন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আপসহীন সংগ্রাম, ৩৬ জুলাইয়ের জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ, গত ১৭ বছরের খুন, গুম ও নির্যাতনের ইতিহাস এবং সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত থাকবে এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে। এটি শুধু একটি ভবন বা জাদুঘর নয়, বরং লাখো মানুষের প্রতিরোধ, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মারক।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের লক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবনকে’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। তবে আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একাধিকবার জাদুঘরটি উদ্বোধনের ঘোষণা দিলেও তা উদ্বোধন করতে পারেনি। উপরন্তু বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এর নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবশেষে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত এই জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-এর ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্বে কাজ করছেন।
এ ছাড়াও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার ও সরকারি বন্ধের দিন বাদে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রবেশ ফি ধরা হয়েছে ৫০ টাকা। শিশুদের প্রবেশ ফি ২০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য প্রবেশ ফি ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের নাগরিকদের প্রবেশ ফি দিতে হবে ২০০০ টাকা।