নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আধুনিকায়ন প্রকল্পের টাকায় কেনা তিনটি বিলাসবহুল পাজেরো জিপের কোনো হদিস মিলছে না। গাড়ি তিনটি কিনতে খরচ হয়েছিল ২ কোটি ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৮০ টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন ও সরকারি অডিটে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
প্রজেক্ট এলাকা বা অফিস; কোথাও খোঁজ মিলছে না গাড়িগুলোর। কারা কোথায় এগুলো ব্যবহার করছে, তারও কোনো সদুত্তর নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।
ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পের আওতায় গাড়িগুলো কেনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। কিন্তু প্রকল্প শেষ হতে চললেও সেগুলো সরকারি ট্রান্সপোর্ট পুলে জমা দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া বরাদ্দের বাইরে অর্থ খরচ, পরামর্শকদের বিশেষ সুবিধা, বিভিন্ন বিলের নামে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং কারিগরি বিপর্যয়সহ নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে আইএমইডির প্রতিবেদনে।
পরিবহন পুলে জমা হয়নি ২৪ গাড়ি
অডিট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি পাজেরো জিপ প্রকল্প এলাকায় নেই। ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে একটি জবাব পাঠানো হলেও অডিট আপত্তি এখনও নিষ্পন্ন হয়নি। শুধু পাজেরো নয়, প্রকল্পের আওতায় মোট ২৪টি যানবাহন কেনা হয়েছিল। প্রকল্প শেষ হতে চললেও এসব গাড়ি পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়নি।
গাড়ি গায়েব ছাড়াও আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রকল্পে মোট ১৪টি অডিট আপত্তি উঠেছে। এর মধ্যে মাত্র একটি নিষ্পত্তি হয়েছে, বাকি ১৩টি এখনও অমীমাংসিত। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার (আরডিপিপি) অনুমোদন ছাড়া ১৫ কোটি ৮৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে মূল চুক্তির শর্ত ও বরাদ্দ পরিবর্তন করে অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ৩৬ কোটি ১৫ লাখ ২৫ হাজার টাকার কাজ দেখানো হয়েছে।
সরকারের রাজস্ব ক্ষতি
প্রকল্পের ঋণ ফি (লোন ফি) ও রাজস্ব আদায়ে নানা অসংগতি ধরা পড়েছে অডিটে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (আরডিপিপি) ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা লোন ফির সংস্থান থাকলেও তার বাইরে আরও অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এইচএসবিসি ব্যাংককে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৬ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি, লোন ফির ওপর নির্ধারিত ১৫ শতাংশের বদলে মাত্র ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

একইভাবে বিদেশি পরামর্শকদের বেতন থেকে আয়কর কম কাটায় সরকার আরও ৫৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার রাজস্ব হারিয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের সরকারি টাকায় পরামর্শকের বাসার ১ লাখ ৫ হাজার টাকার খাবারের বিল পরিশোধ এবং বিধিবহির্ভূতভাবে ৬৩ লাখ ১১ হাজার টাকার ছুটি নগদায়নের মতো গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে অডিট প্রতিবেদনে।
বছরে রাষ্ট্রের ক্ষতি ১১৫ কোটি
অডিট অধিদপ্তরের হিসাবে, প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হলে ও কার্যকর থাকলে প্রতিবছর ১১৫ কোটি ৮৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা লাভ হতো রাষ্ট্রের। কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় বছরের পর বছর এই বিপুল অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। প্রতিবছর ১১৫ কোটি টাকা হিসাবে গত কয়েক বছরের বিলম্বের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকশ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে রাষ্ট্র।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে এখন মেয়াদ নেওয়া হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত, যা মূল সময়সূচির তুলনায় ২৯০ শতাংশেরও বেশি। ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। দুই দফা সংশোধনের পর তা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৯ হাজার টাকায়।
৯৭ ভাগ কাজ শেষ, তবু বন্ধ উৎপাদন
প্রকল্পের ভৌত কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ দাবি করা হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন বন্ধ। ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি গ্যাস টারবাইনটি আংশিক উৎপাদনে আসে।
২০২১ সালের ১৬ জুলাই যান্ত্রিক দুর্ঘটনায় গ্যাস টারবাইন কম্প্রেসরের ব্লেড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই উৎপাদন বন্ধ।
দীর্ঘ ৫ বছরেও দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। কম্প্রেসরের ১৭ থেকে ২২ নম্বর রো-এর ব্লেডগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান জিই সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের আদালতে আইনি জটিলতার কারণে যন্ত্রাংশের ওপর বাজেয়াপ্ত আদেশ জারি হয়, ফলে সেগুলো বাংলাদেশে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে।

এই জটিলতার পেছনে ছিল স্মিথ কো-জেনারেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের পুরনো আইনি বিরোধ। ১৯৯৭ সালে হরিপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি নিয়ে শুরু হওয়া এই বিরোধে ১৯৯৯ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চুক্তি বাতিল করে জামানত বাজেয়াপ্ত করে।
প্রতিষ্ঠানটি পরে লন্ডনের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (আরবিট্রেশন কোর্ট) মামলা করে ২০০৩ সালে তাদের পক্ষে রায় পায়। সেই রায়ের ভিত্তিতে তারা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা চালায়।
দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতার পর ২০২৫ সালের ২৬ জুন সুইজারল্যান্ডের আদালত থেকে বাজেয়াপ্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। যন্ত্রাংশ প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায় ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল, আর মেরামত কাজ শুরু হয় ১৮ মে থেকে।
চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে গ্যাস টারবাইন সচল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কম্বাইন্ড সাইকেল উৎপাদনে যেতে আরও চার থেকে পাঁচ মাস সময় লাগবে।
৯ বার প্রকল্প পরিচালক বদল
প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামোয় চরম অস্থিতিশীলতা দেখা গেছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৯ বার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং কাজের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শামছুদ্দিন। প্রকল্পের সামগ্রিক অনিয়ম নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি গত ১৫ জুন দায়িত্ব পেয়েছি। এ ধরনের ঘটনা জানা নেই। আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম। না জেনে বলতে পারছি না।’
অনুমোদিত ৩০ পদের মধ্যে ১০টি বর্তমানে শূন্য। সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর পদ শূন্য থাকায় দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্পের তদারকি কমিটির কার্যক্রমেও ছিল স্থবিরতা। নির্ধারিত ৪০টি সভার বিপরীতে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) বৈঠক হয়েছে মাত্র ১২টি। একইভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিরও (পিআইসি) ৪০টি সভার জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছে কেবল ১৫টি। দুই সভার ব্যবধান কখনও দেড় বছর পর্যন্ত পৌঁছায়, যা প্রকল্পের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়মিত তদারকির অভাবের প্রমাণ।
জ্বালানি সংকট ও পুরোনো যন্ত্রাংশের ঝুঁকি
প্রকল্প সচল থাকা অবস্থায়ও জ্বালানি সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। ২ বছর ৭ মাস সচল থাকলেও এর মধ্যে ১৫ মাসই গ্যাসের অভাবে ইউনিট চালানো সম্ভব হয়নি। গ্যাসের চাপের ওঠানামা ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
আইএমইডি সতর্ক করেছে, জাতীয় গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল চাপের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং যন্ত্রাংশের সুরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হবে।
১৯৮৬ সালের পুরনো ২১০ মেগাওয়াট ইউনিটের যন্ত্রাংশ (স্টিম টারবাইন ও জেনারেটর) মেরামত করে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে এটিকে বড় ধরনের কারিগরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা ও পুরোনো যন্ত্রাংশের ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি রয়েছে। এসব পুরনো যন্ত্রাংশের নির্ভরযোগ্যতা নতুন প্রযুক্তির তুলনায় অনেক কম এবং এগুলো যে কোনো সময় ফের বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ হতে পারে।
পরিকল্পনার অভাব, এক্সিট প্ল্যান নেই
প্রকল্প শেষে এর স্থায়িত্ব বা ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে অনুমোদিত ডিপিপিতে কোনো এক্সিট প্ল্যান রাখা হয়নি। ডাচ প্রতিষ্ঠান কেমার সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্টও ছিল সাধারণ ও ঢালাও। তৃতীয় ইউনিটের সুনির্দিষ্ট যান্ত্রিক অবস্থা বা ঝুঁকি নিয়ে আলাদা কোনো বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা হয়নি।
আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে এসেছে, নতুন ব্লেড প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে মেরামতের কাজ চললেও দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। প্রকল্পের ভেতরকার রাস্তা ও অবকাঠামো তৈরি হলেও সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার তিনটি পাজেরো জিপের হদিস না মেলা, বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি এবং মেয়াদ ২৯০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়া; এই তিন বিষয় প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতিকে জটিল করে তুলেছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে পুনরায় উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও জ্বালানি সংকট ও কারিগরি ঝুঁকি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আইএমইডি বলছে, কারিগরি ত্রুটির সঠিক সমাধান না হওয়া, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং পুরোনো যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা প্রকল্পটিকে দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্প সচল রাখতে আইএমইডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যেসব প্রকৌশলী প্রকল্প নিয়ে বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাদের অন্য দপ্তরে বদলি না করে এই প্রকল্পে পদায়নের মতো সুপারিশ রয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক স্বচ্ছতা ফেরাতে অনিষ্পন্ন ১৩টি অডিট আপত্তি দ্রুত সমাধানে এফএপিএডির সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের তাগিদ দিয়েছে আইএমইডি।