বাংলাদেশের ইতিহাসে একবারই বেড়েছে জুলাই মাস, ২০২৪ সালে। ৩৪ জুলাই (৩ আগস্ট) আন্দোলনে দেশ যখন উত্তপ্ত, তখন সেনা সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান। এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়– ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আর গুলি করবে না সেনা সদস্যরা।
এই এক সিদ্ধান্তেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্যে, সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তের পর কার্যত আন্দোলনের ফলাফল স্পষ্ট হয়। এটি ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করা শেখ হাসিনা পতনের রেড সিগন্যাল। আর দুদিন বেড়ে ৩৬ জুলাই পতন ঘটে শেখ হাসিনার।
জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সেনাবাহিনীর এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীদের মনোবল চাঙা করেছিল। ৩, ৪ ও ৫ আগস্ট পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী এমন যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত না নিলে কী হতো, কেউই জানত না।’
একই সুরে লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর ওই সিদ্ধান্তে মানুষের মধ্যে স্বস্তির জোয়ার বয়ে যায়। গোলাগুলি কম হবে, খুন-খারাবি কম হবে, রক্তপাত কম হবে– এমন একটি স্বস্তির ব্যাপার ছিল। আবার আন্দোলনকারীরাও ভেবেছে– সেনাবাহিনীর সমর্থন শেখ হাসিনার ওপর থেকে হয়তো প্রত্যাহার হয়েছে। এদিক থেকে এটি ছিল ইতিবাচক।’
কী ঘটেছিল ৩৪ জুলাই
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তীব্র আন্দোলনের মুখে সারা দেশে কারফিউ জারি করে আওয়ামী লীগ সরকার। সে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে ছাত্র-জনতা। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্যে ৩ আগস্ট সেনাসদরে বৈঠক আহ্বান করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। শুধু সেনাসদরের সামরিক কর্মকর্তারা নন, অন্যান্য ফরমেশনের কর্মকর্তারা ভার্চুয়ালি বৈঠকে যুক্ত হন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে ওই বৈঠকে ছিলেন– এমন একাধিক কর্মকর্তা জানান, ৩ আগস্ট দুপুর দেড়টা থেকে ১০ মিনিটের বিরতি নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলে বৈঠক। যেখানে আন্দোলন দমনে যে কোনো নেতিবাচক ভূমিকা সেনাবাহিনীর জন্য বদনাম বয়ে আনবে বলে মত দেন কর্মকর্তারা।
বৈঠক সূত্র জানায়, শুরুতে সেনাপ্রধান প্রায় আধা-ঘণ্টা বক্তৃতা দেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন সেনাবাহিনীকে সরকারের নির্দেশে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছে। সেই ব্যাখ্যায় সেনাপ্রধান বলেন, ‘সংকটময় মুহূর্তে সরকার চাইলে আমরা মোতায়েন হতে বাধ্য।’
মাঠে সেনাবাহিনী থাকলেও, তখন পর্যন্ত তাদের হাতে রক্ত লাগেনি বলে নিশ্চিত করেন সেনাপ্রধান। একইসঙ্গে তিনি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সেনা সদস্যরা কোন এলাকায়, কত রাউন্ড গুলি ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে, তা তুলে ধরেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওই বৈঠক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ফাঁস হওয়া কয়েকটি ভিডিওতে সেনাপ্রধানকে দুটি গানের লাইন বলতে শোনা যায়। লাইন দুটি হলো– ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে’ এবং ‘আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে’।
এই লাইন দুটির বিষয়ে ওই বৈঠকে থাকা সেনা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রথমটির মাধ্যমে সেনাপ্রধান বুঝিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনে সরকারের পক্ষে না বিপক্ষে কোন দিকে সেনাবাহিনী যাবে তা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সে সংকট সেনাবাহিনী তৈরি করেনি। এই সংকট নিজেই সেনাবাহিনীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর দ্বিতীয়টির মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন, সরকার থেকে বেশি দমনের নির্দেশনা আসলে সেনাবাহিনী সরকারের বিপক্ষেই অবস্থান করবে।
মাঠ কর্মকর্তাদের মুখে ছিল ‘না’
বক্তব্যের শেষদিকে সেনাপ্রধান মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানতে জুনিয়র কর্মকর্তাদের কথা বলার আহ্বান জানান। এ সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বলতে চাইলে তিনি তাদের থামিয়ে দেন। আর তার এই থামিয়ে দেওয়া জুনিয়র কর্মকর্তাদের মনে শেখ হাসিনা পতনের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিল বলে বৈঠক থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, সেনাপ্রধানের এই নির্দেশনায় ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যায়ের ছয় থেকে সাত অফিসার সরাসরি মত দেন। এ সময় রাজশাহীর মেডিকেল কর্পসের এক নারী অফিসার বাংলায় লেখা আবেগঘন বক্তব্য পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি মা আজ এই মৃত্যুর জন্য কাঁদছে।’
ওই কর্মকর্তা উত্তরায় শহীদ হওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর মুগ্ধ তাঁর প্রতিবেশী ছিল উল্লেখ করে বলেন, ‘মুগ্ধ উত্তরায় আন্দোলনকারীদের পানি বিলাতে গিয়ে নিহত হন।’
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘খুলনায় টহলরত সেনাদের উদ্দেশে আন্দোলনকারীরা যে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশে কখনো শোনা যায়নি।’ তিনি আপ্লুত হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘কীসের জন্য? কার জন্য এসব শব্দ আমাদের শুনতে হচ্ছে?’
বৈঠক সূত্রের দাবি, এই বক্তব্যের সময় অন্যান্য কর্মকর্তারা বলে ওঠেন, তারা আর জনগণের ওপর গুলি করবেন না।
১০ মিনিটের বিরতি, গুলি না করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পর বৈঠকে ১০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয়। সেই বিরতির পরই মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান সেনাপ্রধান। এরপর তিনি বলেন, ‘জনগণের ওপর আর গুলি চলবে না।’ ওইদিন সেনাপ্রধানের মুখ থেকে এই সিদ্ধান্ত আসার পর হলজুড়ে উল্লাস করেন কর্মকর্তারা।