২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ৫ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন মিরাজ। স্বপ্ন ছিল উপার্জন করে বাবা-মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন, ছোট দুই ভাইকে উচ্চশিক্ষিত করবেন। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী মিরাজুল ইসলাম মিরাজ। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েকদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শহীদ হন।
গত ৫ আগস্ট অন্যদের মতো যাত্রাবাড়ী থানার সামনে মাছের আড়ৎ এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন মিরাজ। তার সঙ্গে ছিলেন খালাতো ভাই, পোশাক কারখানার শ্রমিক মোহাম্মদ আলী (২০)। আন্দোলন চলাকালে হঠাৎ পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে মিরাজ ও মোহাম্মদ আলী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।
পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এবং অর্থসংকটও দেখা দেয়। পরে দুজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসায় মোহাম্মদ আলী অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে অস্ত্রোপচার করে মিরাজের শরীর থেকে গুলি বের করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি জীবনযুদ্ধে আর ফিরতে পারেননি। গত ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে (বৃহস্পতিবার) সকাল আনুমানিক ১০টার সময় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
মিরাজ লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া এলাকার মৃত মো. আব্দুস সালাম (৪৫) ও মহসেনা বেগমের (৪০) দম্পতির বড় ছেলে। মেজবাউল ইসলাম (১৮) ও মো. সিরাজুল ইসলাম (১৬)নামে মিরাজের দুই ছোট ভাইও রয়েছে। মেজবাউল একাদশ শ্রেণিতে ও সিরাজুল নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। মিরাজের বাবা ছেলের মৃত্যুর শোক কাটাতে না পেরে কিছুদিন পরই মারা যান।
মিরাজ মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০২১ সালে এসএসসি পাশ করে পরিবার নিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকায় যান। সেখানে ভাড়া বাসায় থাকতো মিরাজের পরিবার। পরে মিরাজ ঢাকার দনিয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন ।
পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে পড়াশুনার পাশাপাশি ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানা এলাকার মাতুয়াইল রশিদবাগে স্থানীয় একটি মোবাইল রিচার্জ ও বিকাশের দোকানে তিনি কাজ করতেন।
অসুস্থ বাবার চিকিৎসা আর ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়াসহ পুরো সংসার চলতো মিরাজের আয়ে। বাবার চিকিৎসার জন্য ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণও করেছে মিরাজ ও তার বাবা। সংসারের হাল ধরতে লেখাপড়ার পাশাপাশি দোকানে কাজ করতেন মিরাজ। মিরাজকে গ্রামবাসী একজন নম্র, ভদ্র ও প্রতিবাদী যুবক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মিরাজ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলে অথচ আজ তিনি আর নেই। তার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবারের উপার্জনের চাকা।
আর্থিকভাবে সাহায্য পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে মিরাজের মা মোহসেনা বলেন, আর্থিক সাহায্য পেয়েছি। জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে আমার পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা ও (নেভি) হেডকোয়ার্টার ঢাকা থেকে আরও ১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। আর তখন সরকারিভাবে আরও কিছু অনুদান পেয়েছি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেসহ দেশের এই আন্দোলনে যত মায়ের বুক খালি হয়েছে এবং এই খুনের সঙ্গে যারা জড়িত আমি তাদের প্রত্যেককে বিচারের আওতায় দেখতে চাই। বর্তমান সরকারের প্রতি এ ব্যাপারে আমার অনুরোধ রইল।
মিরাজের মা মোহসেনা বেগম বলেন, আমার কলিজার টুকরা আর ফিরে আসবে না এটা ভেবেই দুই চোখের পাতা এক হয় না। রাতে আমি ঘুমাতে পারি না।
মিরাজের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন আমার ভাই আমাকে অনেক ভালবাসতেন আজ আমার ভাই দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়ে জীবন দিয়েছে আমি আমার ভাইয়ের খুনিদের সর্বোচ্চ বিচার চাই।
মিরাজের খালাতো ভাই মোহাম্মদ আলী জানান, চোখের সামনে ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ভাইয়ের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। আমি আমার ভাইকে বাঁচাতে পারিনি। আমি চাই যারা জুলাই আন্দোলনে জীবন দিয়েছে এবং যারা আহত হয়েছে তাদের জন্য সরকার দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করুক। আমরা যারা বেঁচে থেকেও মৃত তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করুক।
ভাদাই ইউনিয়ন যুবদলের নেতা আব্দুল আহাদ বলেন, যারা জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল তাদের পাশে দাঁড়ানো সরকারের মানবিক দায়িত্ব এবং আমাদের সরকার জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। যারা আহত তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আদিতমারী উপজেলায় নির্বাহী অফিসার গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, আমরা জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে যদি তারা আমাদের অবগত করে আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবিকভাবে সহোযোগিতা করার চেষ্টা করব।