বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একচ্ছত্রভাবে দেশের একাধিক মেগা প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকার পরামর্শক কাজ পেয়েছিল স্মেক ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিই কনসালট্যান্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান দুটি ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ দোহাজারী–কক্সবাজার–ঘুমধুম রেলপথ প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমাপনী নথি জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় স্মেক ইন্টারন্যাশনালকে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
স্মেক ইন্টারন্যাশনাল হলো অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। এ ছাড়া কর্মসম্পাদন ও চুক্তি প্রতিপালন-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এনএইচএআই) স্মেক ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বিতর্কের পরেও স্মেক ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বড় বড় প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানের হাতে ধারাবাহিকভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের সমর্থন বা প্রভাব ছিল। সেই প্রভাবশালীদের একজন ছিলেন আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য ড. শাম্মী আহমেদ। শাম্মী আহমেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর ছিলেন স্মেক ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক পরিচালক। এভাবে রাজনৈতিক পরিচিতি ও প্রভাব খাটিয়ে স্মেক ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে তাদের একচেটিয়া ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ লাভ করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো মেয়াদে দেশের একাধিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ তদারকি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোতেই সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, নকশাগত সীমাবদ্ধতা, বাস্তবায়নে জটিলতা এবং নির্মাণ তদারকি নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন ও অভিযোগ ওঠে।
একই প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), কর্ণফুলী টানেল, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) এবং বিভিন্ন রেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোতেই সময় বৃদ্ধি, ব্যয় সমন্বয়, নকশা পরিবর্তন এবং বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে সরকারের অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
সর্বশেষ দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সমাপনী নথি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা না দেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
অবসরের পর পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে যোগদান: অনুসন্ধানে দেখা যায়, দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান অবসরের পর স্মেক ইন্টারন্যাশনালে যোগ দিয়েছেন। একইভাবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী শাহরিয়ার হোসেন ২০২১ সালে অবসরের পর প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেন। রেলওয়ের আরও কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাও বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে যুক্ত হয়েছেন। রেলওয়ের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, কোনো প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের পর সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত (পটেনশিয়াল কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক প্রভাব: কালবেলার হাতে আসা নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্মেক ইন্টারন্যাশনালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিই কনসালট্যান্টস লিমিটেডের ব্যস্থাপনা পরিচালক পদে যুক্ত ছিলেন রাজউক ও ঢাকা ওয়াসার সাবেক চেয়ারম্যান ড. ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা। সরকারি চাকরি জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সরকারি দায়িত্বে থাকাকালে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছিল। একই ব্যক্তি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন এবং পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে চূড়ান্ত নোটিস এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম ডুয়েলগেজ রেলপথ প্রকল্পে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে স্মেক ইন্টারন্যাশনাল। ১১ কোটি ২০ লাখ টাকার এই পরামর্শক চুক্তির আওতায় প্রকল্প সমাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি নথি, চূড়ান্ত বিল মূল্যায়ন, প্রকল্প সমাপনী প্রতিবেদন, অ্যাজ-বিল্ট (নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর তৈরি করা চূড়ান্ত দলিল) নকশা এবং হস্তান্তর-সংক্রান্ত নথি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল প্রতিষ্ঠানটির। রেলওয়ের অভিযোগ, বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও এসব গুরুত্বপূর্ণ নথি সময়মতো জমা দেওয়া হয়নি। এ কারণে গত ১৩ মে প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত নোটিস দেওয়া হয়।
নোটিসে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালন না করলে বিল স্থগিত, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, একই বিষয়ে এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পারফরম্যান্স সার্টিফিকেট, চূড়ান্ত বিল মূল্যায়ন, প্রকল্প ও চুক্তি সমাপনী প্রতিবেদন, রেললাইনের প্রকৃত অবস্থান দেখানো ‘অ্যাজ-বিল্ট’ নকশাসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হয়নি।
রেলওয়ের ভাষ্য, এসব নথি না থাকায় প্রকল্পের সমাপনী কার্যক্রম, নিরীক্ষা, চূড়ান্ত অর্থছাড় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছিল।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পের কিছু বিলের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে রেলওয়ের চলমান প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া শেষ হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে কক্সবাজার রেল প্রকল্পের পরিচালক মো. আসাদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলতি বছরের জুনে শেষ হয়েছে। বর্তমানে কিছু দাপ্তরিক কাজ চলমান রয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা নিশ্চিত করতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল মূলত একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ।’