শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ববোধ ও নৈতিকতা চর্চা জোরদারে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) কার্যক্রম সম্প্রসারণে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সাধারণ স্কুল-কলেজের পাশাপাশি এবার মাদ্রাসা, পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পর্যায়ক্রমে বিএনসিসি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দেশব্যাপী বিএনসিসির কার্যক্রম বিস্তৃত করতে প্রথম পর্যায়ে উপজেলাগুলোতে পাইলট ভিত্তিতে তা চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, কার্যক্রম পরিচালনায় গতি আনতে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক চাঁদার হার ৪ টাকা বাড়িয়ে ১০ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম ও একাদশ শ্রেণি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্নাতক (ডিগ্রি ও অনার্স) পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভর্তি বা নিবন্ধনের সময় বছরে ৬ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বার্ষিক এই ফি বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় বিএনসিসি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে প্রশিক্ষণ, ক্যাম্প ও প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে দেশব্যাপী কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও সফল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা বিকাশের লক্ষ্যে মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে বিএনসিসির আওতায় আনার বিষয়ে সভায় নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যদের সম্পৃক্ত করে বিএনসিসির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও নৈতিকতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সে ক্ষেত্রে বিএনসিসি একটি কার্যকর সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ, কারিগরি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা ধারায় বিএনসিসি পরিচালনার জন্য অভিন্ন চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের বর্ধিত চাঁদার সমপরিমাণ অর্থ সরকারি বরাদ্দ থেকে প্রদানের ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে বিএনসিসিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পূর্ণাঙ্গ প্লাটুন গঠনে সাধারণত ৩ থেকে ৫ হাজার শিক্ষার্থীর প্রয়োজন হয়। তাই শুরুতে শিক্ষার্থীসংখ্যা, অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা বিবেচনা করে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মাদ্রাসা, পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিএনসিসির নতুন ইউনিট গঠন করা হবে
এই সিদ্ধান্তের আলোকেও ইতোমধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে দেশের সরকারি ও এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার প্রধানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে বিষয়টি বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিএনসিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পৃথক এক মতবিনিময় সভায় উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কার্যক্রম সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকটি উপজেলায় বিএনসিসির কার্যক্রম চালু করে পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তি, লেখাপড়ায় অনাগ্রহ এবং ঝরে পড়ার প্রবণতা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিএনসিসির মতো সংগঠনের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সঙ্গে বিএনসিসির সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রথম ধাপে ঢাকা পলিটেকনিক ও তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় শুরু হচ্ছে বিএনসিসি
বিএনসিসি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসাসহ কয়েকটি নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে নতুন প্লাটুন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতি, সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিদর্শনের কাজ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস. এম. তৌহিদুজ্জামান জানান, বিষয়টি বোর্ডকে নীতিগতভাবে জানানো হয়েছে এবং শিগগিরই বিস্তারিত নোটিশ ও নির্দেশনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হবে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ধাপে ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চালু হবে।
বিএনসিসি সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ প্লাটুন গঠনে সাধারণত ৩ থেকে ৫ হাজার শিক্ষার্থীর প্রয়োজন হয়। তাই শুরুতে শিক্ষার্থীসংখ্যা, অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা বিবেচনা করে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মাদ্রাসা, পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিএনসিসির নতুন ইউনিট গঠন করা হবে।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান মনে করেন, মাদ্রাসায় সহশিক্ষা কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি ইতিবাচক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবে। এ লক্ষ্যেই পর্যায়ক্রমে মাদ্রাসায় বিএনসিসির কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, মাদ্রাসায় বিএনসিসি চালু হলে শিক্ষার্থীরা শুধু প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগই পাবে না; বরং নেতৃত্ব, শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্ববোধ, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব বিকাশেরও সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি এবং মাদকের মতো নেতিবাচক প্রবণতা শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এসব ঝুঁকি থেকে তাদের দূরে রাখতে স্কাউট, বিএনসিসি, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্কসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বিএনসিসি সেই বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি আরও বলেন, মাদ্রাসায় বিএনসিসি কার্যক্রম চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের পর এখন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। তবে নতুন ইউনিট গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিএনসিসি ব্যাটালিয়নের অনুমোদন অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে ধাপে ধাপে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ইউনিট গঠন করা হবে। এর মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।