‘সকালে মোবাইলে কল আইছে। মনে করছি পোলায় ফোন দিছে, কথা কইবো। কিয়ের কথা..দেহি আগুন আর আগুন। ভালোর লেইগা পাঠাইছিলাম বিদেশ। এমুন জানলে কহনও পাঠাইতাম না’
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন আলী আহমদ। দক্ষিণ আফ্রিকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছেলে আপন আহমেদকে হারিয়েছেন তিনি। ছেলের একটি ছবি বুকে জড়িয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেহেন আমার পোলাডা কত সুন্দর আছিলো। কত লম্বা। নায়কগো মতন। এহন আর নাইগো নাই।’
দক্ষিণ আফ্রিকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত আপন আহমেদের বাবার আহাজারি। ছবি: সমকাল
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কোমানি (সাবেক কুইন্সটাউন) শহরের কাছে একটি দোকানে আগুন লেগে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাদের পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, একজনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। তবে দুই জেলার এই চরাঞ্চলের গ্রামগুলো পাশাপাশি হওয়ায় শোক যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জনপদে।
মঙ্গলবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি উঠোনেই স্বজন আর প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ নীরবে বসে আছেন। কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনার সামনে কোনো কথাই যেন কাজে আসছে না।
আলীরটেক ইউনিয়নের মধ্য ক্রোকের চরের আপন আহমেদ চার বছর আগে সংসারের অভাব ঘোচাতে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। সেখানে একটি দোকানে কাজ করতেন। বাবা আলী আহমদ বলেন, ‘ছেলেটা খুব কষ্ট করে সংসার চালাইত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত। এখন আমার ঘরটাই অন্ধকার হয়ে গেল।’
একই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন একই এলাকার ফাহিম, নুর মোহাম্মদ, তৈলখিরার চরের ফয়সাল, বক্তাবলী ইউনিয়নের শাহীন এবং মুন্সিগঞ্জের রাজ্জাক।
দক্ষিণ আফ্রিকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ফয়সাল হোসেনের বাড়িতে শোকের মাতম। ছবি: সমকাল
শাহিনের চাচা মোক্তার হোসেন বলেন, ‘নয় বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল। কয়েক দিন ধরেই বলত, ওখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না। দেশে ফিরতে চাচ্ছিল। কিন্তু আর ফেরা হলো না।’
পুড়ে যাওয়া দোকানটির অন্যতম মালিক এবং আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রওশন আলী বলেন, দোকানের আবাসিক কক্ষে সাতজন ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ছয়জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্ত করছে স্থানীয় পুলিশ।
দক্ষিণ আফ্রিকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ফয়সাল হোসেনের মার আহাজারি। ছবি: সমকাল
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বার্তা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ ছোট দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই কর্মস্থলেই রাত কাটান। স্বজনদের ভাষ্য, জীবিকার তাগিদে হাজারো মাইল দূরে গিয়ে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এসব তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষ। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল একটি আগুনে।