Image description

সম্প্রতি কয়েক বছরে ভারতের বিজেপি সরকারের ‘পুশব্যাক’ নীতি নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ সন্দেহভাজন বাংলাদেশি চিহ্নিত করার নামে বহু ক্ষেত্রেই পর্যাপ্তভাবে যাচাই না করেই সাধারণ সংখ্যালঘুদের নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে।

বিশেষত বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ, দীর্ঘক্ষণ ধরে আটকে রাখা, আইনি সাহায্যের সুযোগ না দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বিএসএফ দ্বারা সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে এই পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, যদি কোনও ভারতীয় নাগরিকই ভুলবশত এমন অভিযানের শিকার হন তবে তার দায় নেবে কে?

বীরভূমের সুনালি বিবি ও সুইটি খাতুনের ঘটনার পর আবারও একই ধরনের অভিযোগ উঠল উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের গৃহবধূ সাহিদা ফকিরকে ঘিরে। পরিবারের দাবি , ভারতের বৈধ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে মুম্বই থেকে আটক করা হয় এবং পরে আসাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে সাহিদা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় রয়েছেন বলে তার পরিবার আগামীর সময়কে জানায়। এছাড়া তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তার পরিবার।
উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর ব্লকের গোবিন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের গোবিন্দপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা সাহিদা ফকিরের স্বামী জুম্মান ফকির প্রায় বহু বছর ধরে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ে গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করেন। আর স্বামীর কর্মসূত্রেই দীর্ঘদিন ধরে মুম্বইয়ে বসবাস করছিলেন সাহিদা ফকির।

পরিবার অভিযোগ করে যে , ১৯ জুলাই বাজারে বের হওয়ার সময় নভি মুম্বই পুলিশ সাহিদাকে আটক করে। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে একটি হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের দাবি সেখানে তাকে কোনও আইনি সহায়তা নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন যে , তাকে অসম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে তার পরিবার।

ছেলে সাহিন ফকির এবং পুত্রবধূ রূপালির বক্তব্য , তাদের মা প্রায় ২০ বছর ধরে মুম্বইয়ে বসবাস করছেন এবং তিনি ভারতের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা ইতিমধ্যেই প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরেও লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন এবং পাশাপাশি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাদের একটাই দাবি, প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে সাহিদা ফকিরকে বাংলাদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনুক।

অন্যদিকে সাহিদার ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেছে মানবাধিকার সংগঠন মাসুম (বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ)। সংগঠনের সম্পাদক কিরীটি রায় মঙ্গলবার জানান যে , সাহিদাকে প্রথমে মুম্বইয়ের একটি হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল। তার অভিযোগ প্রায় ৯০ ঘণ্টা আটকে রাখার পরও আইন অনুযায়ী তাকে আদালতে তোলাই হয়নি।

এরপর সেখান থেকে তাকে পুনে মিলিটারি এয়ারবেসে নিয়ে যাওয়া হয়। কিরীটি রায়ের দাবি বিশেষ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সাহিদা ফকির সহ প্রায় ৫০ জন সন্দেহভাজন 'বাংলাদেশি নাগরিক'কে ওই হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল। পরে তাদের প্রত্যেককেই বাসে করে অসম বা ত্রিপুরা সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় । অভিযোগ, গভীর রাতে তিনজন মহিলা ও দুজন পুরুষের পাঁচ সদস্যের দলে ভাগ করে সীমান্ত পার করিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পরিবারের আরও দাবি গত ২৩ জুলাই সাহিদার আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র সহ একাধিক ভারতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য নথি নিয়ে তারা মানবাধিকার কমিশন ও কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। সেই সময়ই তারা জানতে পারেন যে, মুম্বই পুলিশ ইতিমধ্যেই অসম সীমান্ত দিয়ে সাহিদাকে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় পাঠিয়ে দিয়েছে এবং বর্তমানে তিনি সেখানকার একটি গ্রামে অবস্থান করছেন বলেও পরিবার জানায়।

পরিবারের অভিযোগ, সাহিদা ফকির ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা এবং তার ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বৈধ নথিপত্র ছিল। অথচ সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই না করেই তাকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়। হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয় এবং পরে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাদের বক্তব্য, এই গোটা প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত নয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারেরও পরিপন্থী। একজন ভারতীয় নাগরিককে যদি পরিচয় যাচাইয়ের পূর্ণ আইনি সুযোগ না দিয়েই অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে তবে তা শুধু একটি পরিবারের নয়। তা নাগরিক অধিকারের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।