বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে র্যাবকে বিলুপ্ত করা হবেনা— এই সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক বা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক হবে.?
বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে একটি নতুন আইনের খসড়া প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে। আগামীকাল বা আগামী পরশুদিন পূর্ণাঙ্গ আইনি খসড়াটি প্রস্তুত হবে। তবে এর আগেই যতটুকু জানা গেছে তা হলো: বাহিনী হিসেবে র্যাব বিলুপ্ত হচ্ছে না, বরং ‘র্যাব’ নাম মুছে ফেলে বাহিনীর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ)'। এছাড়াও বাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচার, রেসপন্সিবিলিটি, ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং ক্যাপাসিটি— ইত্যাদি বিষয়েও নতুনভাবে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গুম কমিশন জানিয়েছিল যে, বাহিনী হিসেবে র্যাবের বিলুপ্তি প্রয়োজন। আর যদি বিলুপ্তিও নাহয় তাহলে অন্ততপক্ষে ম্যাস রিফর্ম করতে হবে। রিফর্মের অনেকগুলো ক্রাইটেরিয়ার মাঝে একটা ছিল- সামরিক বাহিনীর অফিসারদের র্যাবের মত বেসামরিক ল'এনফোর্সমেন্ট ফোর্সে যুক্ত করানো উচিত হবেনা। গুম কমিশনের এই দাবিটি বিএনপি সরকার বিবেচনা করেনি।
আমি যতটুকু জানতে পারলাম, র্যাবের রিফর্মে বিএনপি সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে কমান্ড স্ট্রাকচারে।
যেমন: ফ্যাসিস্ট আওয়ামিলীগের সময় র্যাব নামকাওয়াস্তে পুলিশের অধীনে ছিল। কিন্তু নতুন আইনে র্যাবকে খুব জোড়ালোভাবে পুলিশের অধীন করা হয়েছে।
র্যাবের প্রতিটি ইউনিটের সমস্ত ধরণের অপারেশনাল ক্যাপাসিটি সরকারের হাতে থাকবে। র্যাবের ডাইরেক্টর জেনারেল পুলিশ আইজিপির আদেশ ও নিয়ন্ত্রণে থেকে ইউনিট পরিচালনা করবে। ইউনিটের এডমিন, ফাইন্যান্স এবং অপারেশন্সের রেসপন্সিবিলিটিও সরাসরি ডাইরেক্টর জেনারেলের হাতে থাকবে।
অর্থাৎ র্যাবের কমান্ড স্ট্রাকচারে আমূল পরিবর্তন আনতে বিএনপি বেশ বদ্ধপরিকর বলেই মনে হয়েছে।
কিন্তু কমান্ড স্ট্রাকচার কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ.?
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন আওয়ামিলীগের আয়নাঘর কালচারের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার র্যাব। ডিজিএফআই, অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা অন্য কোনো বাহিনী এত বিশাল পরিমাণ গুমের সাথে সংযুক্ত ছিলনা; যতটা ছিল র্যাব। আর র্যাবের এই সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক ছিল জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং তার নেক্সাস গ্রুপ।
জিয়াউল আহসান অফিসিয়ালি ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এডিজি র্যাব অপারেশন্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। এরপর পর্যায়ক্রমে এডিজি র্যাব অপারেশন্সের দায়িত্ব পালন করেছেন: কর্নেল লতিফ, কর্নেল জাহাঙ্গীর আলম, কর্নেল মোস্তাফা সারোয়ার।
সারাদেশে র্যাবের মোট ১৫টা ব্যাটেলিয়ন রয়েছে। প্রতিটা ব্যাটেলিয়নে চারটা করে কোম্পানি থাকে। একটা হলো: Crime prevention specialized company (CPSC) এবং বাকি তিনটা হলো Crime prevention company (CPC)
সিপিএসসি বা ক্রাইম প্রিভেনশন স্পেশালাইজড কোম্পানি সবসময় এন্টি টেরোরিজম এবং স্পেশাল রিকয়েরমেন্ট অনুযায়ী সরাসরি হেডকোয়ার্টার, র্যাব অপারেশন্সের আন্ডারে কাজ করে। আর সিপিসি বা ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি লোক্যাল পর্যায়ে কমান্ডিং অফিসার বা কোনো একজন কোম্পানি কমান্ডারের আন্ডারে কাজ করে।
আপনি যদি ভাল করে খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন, ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এডিজি র্যাব অপারেশন্স থেকে জিয়াউল আহসান বিদায় নিয়ে এনএসআই, এনটিএমসিতে যাওয়ার পরও ২০১৫ সাল পরবর্তী র্যাবের আন্ডারে হওয়া গুম খুনের সাথে তাকে খুজে পাওয়া যায়। এটা কিভাবে সম্ভব.?
কারণ জিয়াউল আহসান অফিসিয়ালি র্যাবে না থাকলেও সে এবং তার নেক্সাস গ্রুপ র্যাবের মত একটা ডিসিপ্লিন্ড ফোর্সের ভেতরে ডি-ফ্যাক্টো কমান্ড স্ট্রাকচার তৈরী করেছিল।
র্যাবের এই ডি ফ্যাক্টো কমান্ড স্ট্রাকচার ভাঙ্গার জন্যই ২০১৮ সালে আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে এডিজি র্যাব অপারেশন্সের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় কর্নেল জাহাঙ্গীর আলমকে।
জাহাঙ্গীর আলমকে র্যাব অপস দেওয়া হয়েছিল কারণ তার সেনাবাহিনীর একটি ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডে জিএসও-৩ (অপস), সেনাসদরের মিলিটারি অপারেশনস পরিদফতরের জিএসও-২ (অপস) এবং ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট জিএসও-১ এর দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা ছিল। তাছাড়া তিনি আর্মস ফোর্সেস ডিভিশন (এএফডি) এর জিএসও-১ (জয়েন্ট অপারেশন) এর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
কিন্তু অত্যন্ত নিপাট ভদ্র ও খুবই পেশাদার এই লোক ৮ মাসের বেশি টিকতে পারলোনা জিয়ার অত্যাচারে।
জাহাঙ্গীর আলম এডিজি অপারেশন্স থাকতেই জিয়া তার ডি ফ্যাক্টো কমান্ড স্ট্রাকচারের মাধ্যমে এমন কয়েকটা বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড সংগঠিত করালো যে এর দায়ভার এসে পড়লো এডিজি অপারেশন্স জাহাঙ্গীরের ঘাড়ে। প্রমাণ মিললো যে, সিপিএসসি অপারেশন এক্সিকিউট করেছে। আর সিপিএসসি এডিজি অপারেশন্সের আন্ডারে। ফলাফল: জাহাঙ্গীর আলমের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসলো। অথচ জাহাঙ্গীর আলমের উপর যখন নিষেধাজ্ঞা এলো, ঠিক সেই সময়েই কিন্তু জিয়া আয়নাঘরের খলনায়ক। কিন্তু তার উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি..!
একই ঘটনা তোফায়েল মুস্তাফা সারোয়ারের সাথেও ঘটিয়েছিল জিয়া এবং তার নেক্সাস গ্রুপ। ফলাফল: সেও এক বছরের মাথায় এডিজি র্যাব অপারেশন্স থেকে বিদায় নেয় এবং তার উপরেও স্যাঙ্কশন বা নিষেধাজ্ঞা আসে।
সেসময় এমন একটা পরিস্থিতি ছিল যে র্যাব অপারেশন্স বা র্যাব ইন্টিলিজেন্স কোনো একটা অভিযান পরিচালনা করছে কিন্তু লোক্যাল ইউনিট কিছুই জানেনা। রাতে অপারেশন হয়েছে, সকালে পুলিশ লোক্যাল র্যাবের কমান্ডারকে কল দিয়ে বলত যে- ভাই আপনারা কোনো অপারেশন করছেন নাকি? আমরা তো র্যাবের লোকজন।দেখতেছি। লোক্যাল র্যাব তো শুনেই তব্দা খায়া যাইতো।
অর্থাৎ কে কার আন্ডারে অপারেশন এক্সিকিউট করতেছে— কিছুই বোঝা যেত না।
বিএনপি সরকার ঠিক এই জায়গাটাতে দারুন পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত খুবই ভাল হবে আশা করি। যেহেতু সরকার, পুলিশ এবং র্যাবের মহাপরিচালক সরাসরি সুপ্রীম অথোরিটি হিসেবে দায় নিচ্ছে, তাই কোনো বাজে ঘটনা ঘটলে কাউকে না খুজে আমরা সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডিজি র্যাব বা পুলিশের আইজিপিকে প্রশ্ন করতে পারব।
এখন দেখার পালা, ঠিক কতটা ইতিবাচকভাবে এই আইনের বাস্তবায়ন হয়।