Image description

মাসখানেক আগে জন্ডিসে আক্রান্ত হয় শিশু ফাইয়াজ। সম্প্রতি একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ফাইয়াজকে জন্ম দেন মা ফারজানা। গর্ভকালীন অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তখনকার মতো এখনো ফারজানা সুস্থ থাকলেও সন্তানের অসুস্থতায় তার মন ভালো নেই। ফাইয়াজের বয়স এখন এক মাস ১০ দিন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশু ফাইয়াজ মুহাম্মদ রোহান জন্ডিসে ভুগছেন। জন্ডিস সব বয়সের মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। নবজাতক শিশুর জন্ডিস সাধারণত কোনো ভাইরাসজনিত রোগ নয়, এটি রক্তে ‘বিলিরুবিন’ নামক উপাদানের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। তবে একটু বড় শিশু বা বয়স্কদের জন্ডিস প্রধানত হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। যা দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ভাইরাসও জন্ডিসের কারণ হতে পারে।

শিশু ফাইয়াজ হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে কি না, তা জানেন না মা ফারজানা আক্তার। 

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, গর্ভকালীন অবস্থায় আমার যেসব পরীক্ষা করানো দরকার ছিল, তার সবই করেছি। কারণ এটি আমার প্রথম সন্তান। পরিবারের কম-বেশি সবাই স্বাস্থ্য সচেতন। আমি নিজে রোগ প্রতিষেধক বিভিন্ন টিকা গ্রহণ করেছি। তারপরও আমার ছেলে জন্ডিসে আক্রান্ত। এখন চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা চলছে। ইতোমধ্যে একটি টিকাও দেওয়া হয়েছে।

ফারজানা আক্তার বলেন, জন্মের দুই দিন পর ফাইয়াজের জন্ডিস শনাক্ত হয়। বাচ্চার চোখ ও ত্বক হলুদ ছিল। প্রস্রাব গাঢ় রঙের ও মল ফ্যাকাশে হতো। বাচ্চার শরীরে অতিরিক্ত ক্লান্তিভাব ও খাওয়ার অনীহা কাজ করছিল। মাঝে মাঝে পেটব্যথার কারণে কান্নাও করতো। তবে আল্লাহর রহমত আর চিকিৎসকের পরামর্শ ও চিকিৎসায় এখন ফাইয়াজের অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চাচিয়া মীরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ফারজানা আক্তার ও আরিফুল ইসলাম দম্পতি। বর্তমানে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ঘগেয়া গ্রামে শিশু ফাইয়াজকে নিয়ে তার নানার বাড়িতে থাকছেন তারা। স্বামী-স্ত্রী দুইজনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।  

শিশু ফাইয়াজের মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জানা নেই হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস কি। এমনকি এর সংক্রমণ সম্পর্কেও তারা জানেন না। ফাইয়াজ জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার পরই তারা জানতে পারেন হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রামক রোগ, যা লিভারকে আক্রমণ করে।

শিশুটির নানা স্কুলশিক্ষক আমিনুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মানুষ আগের চেয়ে সচেতন হলেও এখনো অনেক রোগের নাম, সংক্রমিত হওয়ার কারণ ও লক্ষণ সম্পর্কে জানে না। এখন যেমন শিশুর জন্মের পর  সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই’র আওতায় পেন্টা (ডিপিটি, হেপ-বি, হিব) ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ে থাকে। এই ভ্যাকসিনের মধ্যেই যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের প্রতিষেধক রয়েছে, আমরা আগে সেটা জানতাম না।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহফুজার রহমান বাঁধন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিশুদের জন্ডিস সাধারণত তখনই হয়, যখন লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। এটি কখনো জন্মগত সমস্যা থেকে আসে, আবার কখনো সংক্রমণজনিত কারণে হয়। অনেক সময় কয়েক দিনের মধ্যে জন্ডিস কমে যায়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মারাত্মক রূপ নিতে পারে। শিশুদের জন্ডিস অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা সম্ভব। টিকা গ্রহণ, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবার এতে বড় ভূমিকা রাখে। অভিভাবকদের সচেতনতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাই শিশুকে জন্ডিসের ঝুঁকি অনেকটা কমাতে পারে।

তিনি আরও বলেন, হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ শিশুদের লিভারে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলো স্বল্পমেয়াদি জন্ডিস থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী লিভার জটিলতা পর্যন্ত সৃষ্টি করে। তাই শিশুর জন্ডিসকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। লক্ষণ দেখা মাত্রই অভিভাবকদের উচিত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। 

হেপাটাইটিস ভাইরাস সম্পর্কে জানেন না বেশির ভাগ মা 

পীরগাছার ফারজানা আক্তারের মতো সচতেন মা কিংবা সন্তান প্রসব পরর্বতী স্বাস্থ্য সচতেন মায়ের সংখ্যা খুবই কম। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ— অনেকই তা জানেন না। সাধারণ অবস্থায় শিশুদের হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’-তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও গর্ভাবস্থায় এই ঝুঁকি ৯০ শতাংশ। এতে লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নদ-নদী বেষ্টিত কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের গুরাই পিয়ার চর এলাকায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কথা হচ্ছিল আজিনা বেগমের সঙ্গে। অনেকটা বিস্ময় প্রকাশ করে ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদককে আজিনা বেগম বলেন, আমি হেপাটাইটিস সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। কীভাবে রোগটি ছড়ায় বা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সে বিষয়েও জানা নেই। কখনো চরে কারো কাছে এই ভাইরাসের কথাও শুনিনি।

একই ইউনিয়নের পাকার মাথার এলাকার রাবেয়া বেগম বলেন, এই মাত্র আপনাদের কাছে শুনলাম হেপাটাইটিস নামে অনেকগুলো ভাইরাস আছে। আমাদের স্বাস্থ্য আপারা তো এত কিছু বলেন না। আর কমিউনিটি ক্লিনিকে শুধু পোলিও টিকা দেয়। আমার ছয় মাসের সন্তানকে টিকা দিয়েছে। আবার সময় হলে টিকা দিতে হবে।

চিলমারী উপজেলার বালাবাড়ি হাট এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব সালেহা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, চরের বেশিরভাগ ক্লিনিক বন্ধ থাকে। শহরে যেতে পারি না। গরিব মানুষ বড় ডাক্তারের কাছে যাওয়াও সম্ভব না। আমার স্বামী নেই। একটা ছেলে ও দুইটা মেয়ে— সবাইকে বিয়ে দিয়েছি। ছোট মেয়েটা গর্ভবতী, চার মাস ধরে আমার বাড়িতে আছে। আমরা গ্রামের মানুষ এতো রোগ-জীবাণু সম্পর্কে জানি না।

আজিনা-রাবেয়া-সালেহার মতো গ্রামের বেশির ভাগ মায়ের হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। বলতে গেলে, শহরে-গ্রামে কিংবা শিক্ষিত-অশিক্ষিত মিলে সমাজের বড় একটি অংশই এই ভাইরাস সম্পর্কে অজ্ঞাত।

প্রসবকালীন সহায়ক দাই মায়েদেরও অচেনা হেপাটাইটিস

গ্রামে এখনো যারা বাসাবাড়িতে সন্তান প্রসব করতে দাই মা হিসেবে সহযোগিতা করেন, তাদের অনেকেই হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের সঙ্গে পরিচিত নন। এমনই একজন গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের রাবেয়া বেগম। এই গ্রামে কোনো প্রসূতির জন্মদানের সময় বিশেষ করে দরিদ্র কিংবা অতিদরিদ্র পরিবারের পল্লী চিকিৎসকের পাশাপাশি একমাত্র ভরসা এই দাই মা। তার কাছে এ রোগটি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিবেদকের সামনে সরাসরি হেসে দেন। বলেন, নামই শুনলাম আজ!

রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর হাজীপাড়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব বয়সী ছাবিয়া বেগম। তিনি গর্ভবতী মায়ের সন্তান প্রসবে সহায়ক দাই মা হিসেবে কাজ করে আসছেন। সন্তান প্রসব ও নবজাতকের যত্ন নেওয়ার কাজে তার অভিজ্ঞতা দীর্ঘ ৪০ বছরের।  

ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে ছাবিয়া বেগম বলেন, একজন মেয়ে যখন গর্ভধারণ করে তখন থেকে সন্তান প্রসব পরবর্তী এক বছরের বেশিও সময় আমি মা ও নবজাতক শিশুর সেবাযত্ন করে থাকি। ৪০ বছরে আমার হাতে ২০০টির বেশি মায়ের সন্তান প্রসব হয়েছে। যাতে রোগজীবাণু না ছড়ায় এজন্য আমি সবসময় সতর্কতার সঙ্গে এসব কাজ করে থাকি। তারপরও অনেক সময় মা ও শিশুর বিভিন্ন রকম অসুখ-বিসুখ হয়ে থাকে।

কী কারণে কোন ধরনের রোগ হতে পারে কিংবা হেপাটাইটিস সম্পর্কে ধারণা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডাক্তারের কাজ আর আমার কাজ তো এক না। এখন অনেকেই সিজারিয়ান ডেলিভারি করে সন্তান প্রসব করছে। সেখান থেকেও তো রোগ ছড়াতে পারে। আমি জানতাম না হেপাটাইটিস ভাইরাস কি, এখন আপনার মাধ্যমে কিছুটা জানতে পারলাম। আমার পরামর্শ থাকবে মা হেপাটাইটিস আক্রান্ত হলে যেহেতু সন্তানের শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে, এজন্য গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

প্রসূতিকে রক্ত দিতে গিয়ে হেপাটাইটিস ‘বি’ শনাক্ত

গ্রামীণ জনপদ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সচেতনতার অভাব, নিরাপদ রক্ত সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা-ব্যবস্থার অভাবে হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আক্রান্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ ব্যাহত হলে ঘটতে পারে বিপত্তি। তাই নীরব এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু অনেকেই আক্রান্ত হওয়ার পরও উদাসীন থাকায়, এটি শুধু উদ্বেগই বাড়ায় না বরং নীরবে ঝুঁকিও বাড়ায়। এমনই একজন হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হেলাল। ৩০ বছর বয়সী এই যুবক পেশায় একজন অটোরিকশা চালক।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নাকাইহাট এলাকার হেলাল তার প্রসূতি চাচিকে সন্তান জন্মদানের সময় রক্ত দিতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় পজিটিভ আক্রান্ত বলে জানতে পারেন।  এ ব্যাপারে ঢাকা পোস্টকে হেলাল জানান, চার বছর আগে বিদেশ যাওয়ার সময় ঢাকায় ফিটনেস ও অন্যান্য পরীক্ষার সময় হেপাটাইটিস ‘বি’ শনাক্ত হয়। পরে আর বিদেশ যাওয়া হয়নি তার।

হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস পজিটিভ হওয়ার পরও কেন প্রসূতি চাচিকে রক্ত দিচ্ছিলেন—এই প্রশ্নের উত্তরে হেলাল বলেন, আমি জানি না এ রোগ রক্ত থেকে ছড়ায় বা আমার থেকে অন্য কারো হতে পারে। আমি প্রথমবার শনাক্ত হওয়ার পর অর্থাৎ ৪ বছর আগে ৬ মাস ওষুধ খেয়েছি। তারপর থেকে আর্থিক অভাবের কারণে আর চিকিৎসা করাতে পারিনি।

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে রাহুল নামে এমন আরও একজন যুবকের খোঁজ পায় ঢাকা পোস্ট। গত ২ এপ্রিল বন্ধুর বোনকে রক্ত দিতে গিয়ে হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ শনাক্ত হন রাহুল। এরপর রংপুরে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হলে বন্ধ করেন ওষুধসেবন। কেন ওষুধ খাচ্ছেন না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কোনো সমস্যা নাই। আগেও আমি ভালো ছিলাম, এখনো ভালো আছি। তাই ওষুধ খাই না। পজিটিভ হওয়ার পর পরিবারের কেউই টিকা নেয়নি বলেও জানান রাহুল।

নেই আক্রান্ত-মৃত্যুর পরিসংখ্যান, প্রচার-প্রচারণাও সীমিত

রংপুর বিভাগের সবচেয়ে বৃহৎ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানকার হেপাটোলজি বিভাগে কয়েক বছর ধরে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে হেপাটাইটিস দিবস পালন করে আসলেও তাদের কাছে নেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। নেই মৃত্যুর পরিসংখ্যানও। একই চিত্র রংপুর সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ ও রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের। রংপুরের বাইরের জেলাগুলোতে নেই আক্রান্ত-মৃত্যুর কোনো সঠিক তথ্য। শুধু তাই নয়, জনসচেতনতা সৃষ্টিতে চোখে পড়ার মতো প্রচার-প্রচারণা কিংবা সরকারি উদ্যোগ আছে বলে তেমন তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি।

নীলফামারী জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়, গত এক বছরে এ জেলায় দুজন গর্ভবতী মা হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ শনাক্ত হন। তাদের মধ্যে একজন মা সন্তান প্রসবের পর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন, আরেকজন হাসপাতালে আসেননি।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আসিফ রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, মাসে বা বছরে এই ভাইরাসে কতজন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, এর তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।

গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শিকা লায়লা বিনতে ফিরোজ জানান, চিকিৎসক না থাকায় তাদের কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে সিজার বন্ধ রয়েছে। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ রোগী এলে তাদের আপাতত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ রোগীর পরিসংখ্যান সংরক্ষণে না থাকার কথাও জানান এই পরিদর্শিকা।

হেপাটাইটিস ‘বি’ শনাক্তের হার কম, চিকিৎসায় ঘাটতি নেই

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস সংক্রমিত রোগীর শনাক্তের হার তুলনামূলক কম। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোসহ চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।  
 
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের প্যাথলোজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ মাসে হাসপাতালে প্রায় ৮০০ জনের হেপাটাইটিস ‘বি’ পরীক্ষা করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কোনো রোগী হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ হয়নি।

গাইবান্ধা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার হারুন অর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, রোগটি মারাত্মক সংক্রামক, কিন্তু সেটি নিয়ে সরকারি নিয়মিত কোনো কর্মসূচি নেই। ফলে এটি নিয়ে নার্সিংও কম হয়ে থাকে। তবে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ঘাটতি নেই।

রংপুর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মারুফা আখতার জাহান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত মা ও শিশু শনাক্তকরণে নিয়মিত পরীক্ষা করে থাকি। এখানে যারা শনাক্ত হয়, তাদেরকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে উন্নত চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা হয়।

তিনি আরও জানান, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের প্যাথলজি ল্যাবে গত বছরের ২ জুলাই থেকে চলতি বছরের ২৬ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ১৮৬ জনের হেপাটাইটিস ‘বি’ পরীক্ষা করে ৬ জন রোগী পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই’র আওতায় জন্মের পর শিশুদের হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসসহ পাঁচটি রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ভ্যাকসিন নিয়মিত দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. কামরুজ্জামান ইবনে তাজ। 

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিশুর জন্মের পর থেকে এক বছর তিন মাস বয়সের মধ্যে পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এই টিকার মধ্যেই হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের প্রতিষেধক রয়েছে। এই টিকা সরকারিভাবে শুধুমাত্র শিশুদের দেওয়া হয়। বড়দের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ নেই।  
 
এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের ৫টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস প্রতিষেধক টিকা প্রদান করা হয়। গত বছর ১৬ হাজার ৫৮২ জন শিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোসহ এসব রোগের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ মা ও শিশুর কোনো পরিসংখ্যান তাদের সংরক্ষণে নেই।  

‘সাইলেন্ট কিলার’ ভাইরাস হেপাটাইটিস, দরকার সচেতনতা

হেপাটাইটিস মানে লিভারে প্রদাহ। সাধারণত ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মাধ্যমে এটি হয়ে থাকে। পাঁচটি প্রধান ধরন এ, বি,সি,ডি ও ই। এর মধ্যে ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কারণে সবচেয়ে বিপজ্জনক। সময়মতো চিকিৎসা না করলে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেলিওর এবং এমনকি লিভার ক্যান্সার হতে পারে।

চিকিৎসকসহ এই রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিসের কোনো উপসর্গ থাকে না, ফলে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে তারা আক্রান্ত। সে হিসাবে হেপাটাইটিসকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরবঘাতক বলা হয়।

রংপুর জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফিরোজ হাসান খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসকে নীরবঘাতক বলা হয়। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য লক্ষণ দেখা যায় না। গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ কিংবা ‘সি’-এর জীবাণু থাকে, তাহলে ৬ সপ্তাহের মধ্যে সন্তানের দেহে প্রবেশ করে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে আমাদের বেশিরভাগ গর্ভবতী মা পরীক্ষা না করার কারণে এসব ভাইরাস সম্পর্কে জানতে পারেন না। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সন্তান জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বাসাবাড়িতে সন্তান প্রসব করলে এই ভ্যাকসিন খুব একটা দেওয়া হয় না। এ কারণে ইপিআই’র আওতায় শিশুদের পেন্টা টিকা গ্রহণে অভিভাবকদের উৎসাহিত করা হয়ে থাকে।  

পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সায়েম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের দেশে অনেকক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীরা তাদের স্বামীর মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। অনেক পুরুষ বাইরের সেলুনে চুল বা দাড়ি কাটানোর সময় একই ব্লেড বারবার ব্যবহার করার কারণে সংক্রমিত হন। হেপাটাইটিস ‘বি’ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব এবং একবার ব্যবহারের ব্লেড পুনরায় ব্যবহার করাই এর অন্যতম কারণ। পরে আক্রান্ত স্বামীর মাধ্যমে স্ত্রী সংক্রমিত হয়। মায়েদের কাছ থেকে গর্ভফুলের মাধ্যমে এই ভাইরাসটি শিশুদের কাছে চলে যায়। এ কারণেই শিশুরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান ১০টি কারণের মাঝে অন্যতম একটি হলো লিভার সিরোসিস। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো আমাদের বাংলাদেশেও এটি ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। বিশেষ করে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান প্রসবের হার অনেক পিছিয়ে থাকায় বাড়িতে সন্তান প্রসবের ফলে এই ঝুঁকি আরও বেশি। এ কারণে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’-তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সচেতনতার বিকল্প নেই।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. জিয়া হায়দার বসুনিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, গর্ভাবস্থায় শিশুদের হেপাটাইটিসের ঝুঁকি ৯০ শতাংশ। আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক সন্তান প্রসবের হার অনেক পিছিয়ে। এখনো বাড়িতে ৫০ শতাংশের বেশি প্রসব হচ্ছে। কিন্তু মা ও দাইয়ের কেউই এ ব্যাপারে সচেতন নন। এতে করে মায়ের মাধ্যমে সন্তান সংক্রমিত হচ্ছে। এর জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রত্যেক গর্ভবতী নারী একবার হলেও যেন হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস পরীক্ষা করান, পারলে গর্ভধারণের আগেই করাতে হবে।

লিভার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসকের মতে, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস মানুষের স্বাস্থ্য বিশেষ করে লিভারের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। ২০-২৫ বছর ধরে হেপাইটাইটিস নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করা হচ্ছে । এর আগে এই ভাইরাসকে আমরা জন্ডিস হিসেবেই জানতাম। তবে হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে সরকারের সবচেয়ে সফল উদ্যোগ হলো ভ্যাক্সিনেশন।  

চিকিৎসার চেয়ে যেকোনো রোগ প্রতিরোধ সবচেয়ে উত্তম উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাঁচ রকমের হেপাটাইটিস ভাইরাস রয়েছে। এসবের মধ্যে ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে হেপাটাইটিস নিয়ে কুসংস্কার ও বৈষম্য আছে, তা দূর করতে হবে। রোগীদেরকে কোনোভাবেই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সময় মতো শনাক্ত ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিনই বাড়ছে এই নীরব ঘাতকের ভয়াল থাবা। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সচেতনতার অভাব, নিরাপদ রক্ত সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা-ব্যবস্থার অভাবে এই সংক্রমণ আরও বাড়ছে।

হেপাটাইটিসে দেশে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের আহ্বানে বিশ্বব্যাপী ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মোতাবেক, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে প্রায় ১ কোটি মানুষ আক্রান্ত। বেসরকারি হিসাবে হেপাটাইটিসে দেশে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ১০ জনের ৯ জনই জানেন না তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। প্রতি বছর গোটা বিশ্বে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন লোক মারা যায়, প্রতি সেকেন্ডে মারা যায় একজন।

সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, নীরব ঘাতক ভাইরাল হেপাটাইটিস ‘বি’ অথবা ‘সি’ ভাইরাসে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে আক্রান্ত। বিশ্বব্যাপী লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’। লিভার ক্যান্সারে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী এই দুইটি ভাইরাস। বাংলাদেশে আনুমানিক ৫.৭ শতাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস ‘বি’ অথবা ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।

হেপাটাইটিস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ, হাত ধোয়া, নিরাপদ রক্তদান ও গ্রহণ, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘বি’-এর টিকা নেওয়া, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি-এর পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে জানান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার বিভাগের প্রধান ডা. মো. জিয়া হায়দার বসুনিয়া। একই সঙ্গে নিরাপদ ইনজেকশন, দাঁতের চিকিৎসা, ব্লেড, কানের ছিদ্র এবং রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, গর্ভাবস্থায় সঠিক চিকিৎসা ও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে টিকা দিলে সংক্রমণ ঝুঁকি ৯০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে কমানো সম্ভব।

এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মাসুম বিল্লাহ (গাইবান্ধা), নুর হাসান (পঞ্চগড়), মমিনুল ইসলাম বাবু (কুড়িগ্রাম) ও শাহজাহান ইসলাম লেলিন (নীলফামারী)।