রাজধানীর আবদুল গনি রোডের শিক্ষা ভবনটিকে এক সময় সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা- এনএসআই “দুর্নীতির ভবন” বলে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু শিক্ষায় ঘুষ-দুর্নীতি এখন আর শুধুমাত্র এই ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারাদেশেই এর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে। তবে ভবন থেকেই ঘুষ-দুর্নীতির নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা ক্যাডারের বর্তমানে সর্বোচ্চ পদে যিনি আছেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল স্বয়ং এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা ছাড়াও বাইরের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও ডিজি সোহেলের ঘুষ কালেকশনের কাজে নিয়োজিত আছেন। অবাক ব্যাপার হলো, অনেক ক্ষেত্রে দালালদের নিজস্ব ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমেও ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য শীর্ষকাগজ-শীর্ষনিউজের হাতে এসেছে। অতীতে আওয়ামী লীগ আমলে যারা শিক্ষাখাতে দালাল হিসেবে কাজ করেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরাই ডিজি খান মইনুদ্দিন সোহেলের অধীনে নিয়োজিত রয়েছেন, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ উভয় সেক্টরের জন্য আলাদা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন ডিজি সোহেল। খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল যেহেতু বিএনপির আগের আমলে আ ন ম এহছানুল হক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে প্রতিমন্ত্রীর এপিএসের দায়িত্ব পালন করেছেন তাই শিক্ষাখাতের দুর্নীতির ফাঁক-ফোকরগুলো সবই তাঁর জানা। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। মূলতঃ এই সময়ই ঘুষ লেনদেনের দেশব্যাপী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন খান মইনুদ্দিন সোহেল। যা পরবর্তীতে ডিজি (মহাপরিচালক) পদে আসীন হওয়ার পর ব্যাপকভাবে বিস্তৃতিলাভ করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ঘুষ কান্ডে ভেঙ্গে পড়েছে শিক্ষা খাতের শৃঙ্খলা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জুনিয়রদের পদায়ন করা হচ্ছে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে। ফ্যাসিস্ট চিহ্নিত কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসানো হচ্ছে পুরনো ফ্যাসিস্টদের! এর মধ্যেই রয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদস্য, বঙ্গবন্ধু গবেষক ইত্যাদি।
ডিজির ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছেছে
এসব বদলি বাণিজ্য এবং ঘুষ লেনদেন নিয়ে মাঝেমধ্যে সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। কখনো কখনো ঘুষের রেট কমবেশির কারণে অগ্রিম টাকা নিয়েও বদলির কাজ সম্পন্ন করছেন না ডিজি সোহেল। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একটি পদের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা দিয়েছেন তিনি। ফলে সবার কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ঘুষের টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। এ নিয়ে তদবিরকারী গ্রুপগুলোর সঙ্গে ডিজি সোহেলের মনোমালিন্য, বাক-বিতণ্ডাও হচ্ছে। এমনকি মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত অভিযোগ যাওয়ারও নজির সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, অতি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এ রকমের গুরুতর এক অভিযোগ দিয়েছেন মাগুরার যুবদল নেতা নয়ন, যিনি ‘স্লোগান নয়ন’ হিসেবে পরিচিত। অভিযোগটি হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের একজন শিক্ষা পরিদর্শকের বদলির আদেশ বাতিল করা নিয়ে। নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক মো. সাইফুর রহমান সুমনকে ইতিপূর্বে অন্যত্র বদলি করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশটি জারি হয়। খান মইনুদ্দিন সোহেল তখন শিক্ষামন্ত্রীর পিএস পদে ছিলেন। পরবর্তীতে এই বদলির আদেশ বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সোহেল ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেন। সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ‘মৃধা’ নামে এক দালালের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেনটি হয়। কিন্তু এর আগে সুমনের জায়গায় অন্য আরেকজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করেন সোহেল আরও বড় অংকের ঘুষ নিয়ে। ওই কর্মকর্তাকে সরানো যায়নি, তাই শিক্ষা পরিদর্শক সুমনেরও বদলির আদেশ বাতিল করা যায়নি। তবে সুমনের কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের ২০ লাখ টাকাও ফেরত দেননি ডিজি খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। এ নিয়ে অনেক চেষ্টা-তদবিরও করেন সুমন। অবশেষে নিজের মাগুরা এলাকার যুবদল নেতা নয়নের সহায়তা চান। যুবদল নেতা নয়ন এ বিষয়ে ডিজি সোহেলের সঙ্গে কথা বলেন একাধিকবার। তাতে ব্যর্থ হয়ে শেষে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেন। অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা। এতো কিছুর পরও ডিজি খান মইনুদ্দিন সোহেল ঘুষের ওই টাকা ফেরত দেননি। তবে টাকাটা-তো তাঁর পকেটে নেই, তাই দিতে পারছেন না- একথা বলছেন সোহেলের ঘনিষ্ঠরা।
বদলি বাণিজ্য ও ঘুষ লেনদেনে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙেছে
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর অর্থাৎ ডিজি অফিসে বদলি বাণিজ্য ও ঘুষ লেনদেনের এখন যেসব কাজ কারবার চলছে তাতে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে গেছে। শিক্ষা ভবন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ডিজি খান মইনুদ্দিন সোহেল যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ঘুষ লেনদেন জড়িত হয়েছেন এ রকমের পরিস্থিতি অতীতের কোনো ডিজির ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। ছোট-খাটো লেনদেনও তিনি নিজে সরাসরি জড়িত হচ্ছেন। ঘুষ ছাড়া তিনি কোনো কাজেই হাত দেন না। ঘুষ লেনদেনে খান মইনুদ্দিন সোহেলের হাত পেকে গেছে ইতিপূর্বে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর এপিএস থাকাকালেই। মূলত: এ যোগ্যতার কারণেই এবার শিক্ষামন্ত্রীর পদ লাভের পর সোহেলকে পিএস (একান্ত সচিব) পদে নিয়োগ দেন এহছানুল হক মিলন। তাও নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে। পিএস-এপিএস পদগুলো জনপ্রশাসনের। নিয়ম অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ই পিএস-এপিএস পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী আ ন হ এহছানুল হক মিলন তা শুনতে রাজি নন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেই তিনি এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারির ব্যবস্থা করেন। তখনকার শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীন অবশ্য এ ধরনের অবৈধ অফিস আদেশ জারিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু যেহেতু তাঁর নিজের চেয়ারও টলটলায়মান তাই মন্ত্রীর ওই অবৈধ নির্দেশ পালনে বাধ্য হন সচিব রেহানা পারভীন। অফিস আদেশটি জারি হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। পরবর্তীতে পিএস পদ থেকে তাকে সরাসরি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) করা হয়। কিন্তু ড. সোহেলের এই ডিজি পদে নিয়োগ নিয়েও তখন অনেক নাটকীয়তা তৈরি হয়।
একেতো, তিনি আগে থেকেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। ৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পরে পরিচালক (মাধ্যমিক) পদে এসে দেড় বছরে প্রায় ১৭০০ শিক্ষক বদলি করেন। এসব বদলি বাবদ হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া, শিক্ষা ক্যাডারের তাঁরচেয়ে সিনিয়র ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশিক্ষণ) পদ থেকে অবসরে যাওয়া মোহাম্মদ আবদুস সবুরকে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি মহাসচিবের সুপারিশটি বেশ কিছুদিন ঝুলে ছিল। শিক্ষাসচিব আবদুল খালেক পূর্ব নির্ধারিত বিদেশ সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে বিএনপি মহাসচিবের ওই সুপারিশ অনুযায়ী আবদুস সবুরকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নথি অনুমোদন করেন। কিন্তু নথিটি মন্ত্রীর দপ্তরে গেলে মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি নথির প্রস্তাব নাকচ করে শাখায় পাঠিয়ে দেন এবং পিএস ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলকে চলতি দায়িত্বে ডিজি পদে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে নথি উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। তড়িৎ গতিতে সেভাবেই নথি উপস্থাপিত হয়। পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার) ছুটির দিনে বিশেষ ‘বার্তা বাহক’ এই নথিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠান মন্ত্রী। কিন্তু সোহেলকে ডিজি নিয়োগের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন না করে ফেরত দেন। এতে মন্ত্রী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। প্রধানমন্ত্রী নাকচ করার পরও তিনি একই ব্যক্তি অর্থাৎ পিএস সোহেলকে অতিরিক্ত দায়িত্বে ডিজি পদে নিয়োগের অফিস আদেশ জারি করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ অফিস আদেশটি জারি হয় ১৬ এপ্রিল। এ নিয়ে তখন ব্যাপক কানাঘুষা চলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনা হয়। এর এক সপ্তা পরে ২৩ এপ্রিল তাকে চলতি দায়িত্বে ডিজি করা হয়।
শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিএস থেকে ডিজি পদে নিয়োগ এবং এতো বেপরোয়া ঘুষখোর কর্মকর্তা অতীতে কখনো অধিদপ্তরের ডিজি অর্থাৎ শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ এই পদে নিয়োগ পাননি। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত জুনিয়রও বটে। এসব দিক থেকে ডিজি সোহেল অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙেছেন। তাছাড়া ডিজি পদে নিয়োগের পর থেকে খান মইনুদ্দিন সোহেল বদলি বাণিজ্য ও ঘুষের যে নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি করেছেন তাতে অতীতের সকল নজির ছাড়িয়ে গেছে, এতে কারো সন্দেহ নেই। যুবদল নেতা নয়নের অভিযোগের চাক্ষুষ উদাহরণ ইতিমধ্যেই এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। শীর্ষকাগজের চলতি সংখ্যার আরেকটি আলাদা প্রতিবেদনে ঘুষ সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া ঘুষের রেট নির্ধারণ এবং নেটওয়ার্ক বা দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলা ও এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের নতুন নজির তো রয়েছেই।
ডিজি সোহেলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতের সংগৃহীত কোটি কোটি টাকার ভাটবাটোয়ারায় মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ পান ড. সোহেল। বড় একটি অংশ চলে যায় মন্ত্রীর বাসায়। মন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে সোহেলের পরিচয়-সম্পর্ক রয়েছে এপিএস থাকাকালেই। সেই সূত্রে মন্ত্রীর বাসায় সোহেলের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে বলে জানা যায়।
মহাপরিচালক পদে বসে নিজেরই পরিচালক পদের পদায়নগুলো পাল্টে দিলেন!
ড. খান মইনুদ্দিন সোহেল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিচালক (মাধ্যমিক) থাকা অবস্থায় ডিজি অফিস ছাড়াও ঢাকা শহরের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যেক জেলায় একাধিক শিক্ষক নিয়ে গড়ে তুলেন বদলি বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক বা সিন্ডিকেট। অনেক ক্ষেত্রেই কলেজ এবং স্কুল পর্যায়ের সিন্ডিকেট একযোগে কাজ করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলাদা নেটওয়ার্কও রয়েছে। পরিচালক (মাধ্যমিক) পদে থেকেই ঘুষ লেনদেনের একটি অঘোষিত রেট নির্ধারণ করেছেন তিনি। তবে মহাপরিচালক পদে বসার পরে সেই রেট পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলে জানা যায়। যেমন- ঢাকা শহরে প্রধান শিক্ষক স্কুলভেদে ৫-১০ লাখ টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসার জেলার গুরুত্ব অনুসারে ৫-১০ লাখ, উপপরিচালক ২০-৩০ লাখ টাকা। সহকারী শিক্ষক ঢাকা শহরে ২-৩ লাখ টাকা, ঢাকার বাইরে ১-২ লাখ টাকা। কলেজের ক্ষেত্রেও তেমনই। কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ যে কোন দপ্তরের চেয়ারম্যান- দেড় থেকে দুই কোটি টাকা, ডিজি পর্যায়ের- দুই কোটি বা তদুর্ধ্ব পরিমাণ, পরিচালক পর্যায়ের পদ এক কোটি, বড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ ৩০-৫০ লাখ, আঞ্চলিক পরিচালক পদ ৩০-৪০ লাখ টাকা ইত্যাদি। এছাড়া শিক্ষা ক্যাডারের অন্যান্য পদগুলো ২ লাখ থেকে গুরুত্বভেদে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এই টাকা-তো শুধুমাত্র মহাপরিচালক নেন, দালালরা নেন আরও প্রায় সমপরিমাণ টাকা। বিএনপিপন্থি অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শগত মিল থাকার প্রয়োজন নেই, বরং আগের ক্ষমতাবান আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। কারণ, তাদের হাতে আছে প্রচুর পরিমাণে টাকা।
শিক্ষা ক্যাডারের যেসব বদলি-পদায়নের দায়িত্বে রয়েছে মন্ত্রণালয়- সেগুলোও পুরোপুরোই নিয়ন্ত্রণ করছেন ডিজি ড. সোহেল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিন অসংখ্য বদলি-পদায়নের দরখাস্ত জমা পড়ে। এইসব দরখাস্ত গ্রহণ এবং তাতে মার্ক করারও সুব্যবস্থা আছে মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা এগুলোতে স্বাক্ষর করে সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠান। কিন্তু আদতে এইসব দরখাস্তে কোনো কাজ হয় না। যারা বদলি-পদায়নের ব্যাপারে অতি আগ্রহী তাদেরকে মন্ত্রণালয়ের ভেতর থেকেই বলে দেওয়া হয়, কোথায় বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ডিজি সোহেলই সবকিছুর মূলে এটা মোটামুটি সবাই জানেন। সোহেলের সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো বদলির নথি মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপিত বা অনুমোদন হয় না, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পিএস পদে বসেই দুর্নীতির ধরন পরিবর্তন করেছেন ড. সোহেল। শুধু টাকাই নয়, টাকার সঙ্গে আবেদনে মন্ত্রী কিংবা এমপির কাছ থেকে সুপারিশ বাধ্যতামূলক করেছেন তিনি। তবে মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশের বিষয়টা হলো লোক দেখানো। অর্থাৎ মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশের নাম ভাঙিয়ে ডিজি সোহেল দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন অধিদপ্তরকে। আদতে বদলির ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয় না। টাকা যার বদলি তার। দেশের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় বা কলেজের যে কোনো শিক্ষককে প্রশ্ন করা হলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে। বিএনপির নাম ব্যবহার করে মহাপরিচালক সোহেল যা করছেন তা বিএনপির জন্য খুবই অশনিসংকেত। বিগত সরকারের আমলে যেসব শিক্ষক ফ্যাসিস্টের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন তাদের মধ্যে থেকে বেশকিছু শিক্ষককে সোহেল পরিচালক (মাধ্যমিক) থাকা অবস্থায় শাস্তিমূলক বদলি করেছিলেন জনস্বার্থে। কিন্তু তিনি মহাপরিচালক পদে বসার পর ফ্যাসিস্টের সহযোগী ওই শিক্ষকদের প্রায় সবাইকে পূর্বপদে ফিরিয়ে এনেছেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। কাউকে কাউকে আগের চেয়েও আকর্ষণীয় পদায়নের চমক দেখিয়েছেন ডিজি সোহেল। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে এই শিক্ষকদের এমন জায়গায় ফিরিয়ে এনেছেন যেখানে তাদের পদায়নের সুযোগ নেই অর্থাৎ ওই বিষয়ের পদ শূন্য নেই। এমন অনেক শিক্ষক আছেন যাদেরকে কয়েক মাস আগে ‘জনস্বার্থে’ বদলি করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই তাদেরকে ‘অফিস আদেশে’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে পূর্বের কর্মস্থলে। এমন কিছু বিতর্কিত শিক্ষককে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বদলি করে আনা হয়েছে, যা সারাদেশের শিক্ষকদের অবাক করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে ৩ জন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট চিহ্নিত শিক্ষককে কয়েকমাস আগে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু বদলির কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের ৩ জনের একজনকে ময়মনসিংহের ফুলপুরে আনা হয়। কয়েকদিন আগে সদ্য বদলি করে আনা ওই শিক্ষকসহ মোহনগঞ্জের ফ্যাসিস্ট সমর্থক আরেক শিক্ষককে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুলে বদলি করে আনা হয়েছে। আরও অবাক করার বিষয় হলো, ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুলের ব্যবসা শিক্ষার একটি শূন্য পদের বিপরীতে একজন মানবিক বিজ্ঞান ও একজন গণিতের শিক্ষককে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। একইভাবে টাঙ্গাইল বি. বি. সরকারি বালক/ বালিকা বিদ্যালয়ে একটিও ইংরেজি শিক্ষকের শূন্য পদ না থাকলেও ৪ জন ইংরেজি শিক্ষককে এখানে বদলিভিত্তিক পদায়ন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঢাকা থেকে শেখ রাসেল উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ফ্যাসিস্ট চিহ্নিত শিক্ষক, যিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগের ব্যানার হাতে জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে লাঠি হাতে শাহবাগে বসে ছিলেন- এই ছবিটি তখন সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। ওই শিক্ষককে ড. সোহেল পরিচালক (মাধ্যমিক) থাকাকালে পার্বত্যঞ্চলে শাস্তিমূলক বদলি করেছিলেন। কয়েকদিন আগে তাকে ধানমণ্ডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করে আনা হয়েছে। অর্থাৎ তাকে শেখ রাসেল উচ্চ বিদ্যালয়ের চেয়েও আকর্ষণীয় পদায়নে দেওয়া হয়েছে। কত টাকার বিনিময়ে ডিজি সোহেল এটা করেছেন, এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।
শিক্ষা ক্যাডারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ হলো পরিচালক, কলেজ ও প্রশাসন। ড. সোহেল মহাপরিচালক পদের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ১৩ এপ্রিল এই পদে পদায়নের ব্যবস্থা করেন ফরিদপুরের সরকারি আইনউদ্দীন কলেজের অধ্যক্ষ মো. নাজমুল হককে। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি আইনউদ্দীন কলেজে একনাগাড়ে ১০ বছর ৫ মাস অধ্যক্ষ পদে ছিলেন। অথচ তাকেই পছন্দ সোহেল এবং মন্ত্রীর। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই জাবি ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি এম এম সহিদুল ইসলামকে কোনো কারণ ছাড়াই ডিআইএ’র পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে রাজেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সংযুক্তি দিয়ে ওএসডি করা হয়েছে। অবশ্য, এর কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। তা হলো, নতুন যাকে এই পদে পদায়ন দেওয়া হয়েছে মো. আলফাতুন, তিনি শিক্ষা ক্যাডারের ২০ তম ব্যাচের অর্থাৎ অত্যন্ত জুনিয়র কর্মকর্তা এমনকি আওয়ামীপন্থি হিসেবেও পরিচিত, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেছে নাকি এককালীন ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতি মাসে পাওয়া যাবে আরও ৫ লাখ টাকা করে। সম্প্রতি শিক্ষা অধিদপ্তরের বেসরকারি কলেজ শাখায় সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন মো. ফিরোজ মিয়া। তিনি ৩০তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের শিক্ষা ক্যাডার সমিতির আওয়ামীপন্থি প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন তিনি। ‘বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে প্রবন্ধ লিখে বাড়তি সুবিধা নেন তিনি। এর আগে চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল তাকে শিক্ষা প্রশাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয়। শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে একের পর এক মো. ফিরোজ মিয়ার পদায়নকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। শুধু এগুলোই নয়, এ রকমের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
লেনদেনের দালাল নেটওয়ার্ক
খান মইনুদ্দিন সোহেলের বদলি বাণিজ্য ও অর্থ লেনদেনের কাজে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে ইতিপূর্বে সারোয়ার হোসেন, নাজিম উদ্দিন, কাওসার আহমেদ অন্যতম ছিলেন। আর্থিক লেনদেন নিয়ে এদের সঙ্গে সমস্যা বেধে যাওয়ায় নানা অভিযোগ তুলে বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে শাস্তিমূলক বদলির ব্যবস্থা করেন সোহেল। শিক্ষা ভবনে বর্তমানে অর্থ লেনদেনে মূল ভূমিকায় রয়েছেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর খোকন রানা, পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) এর পিএ আবদুর রহিম এবং ডিজির পিএ ফরহাদ। ক্ষমতাবান ফরহাদ ইতিপূর্বে অন্তত ৭ জন ডিজির পিএ’র দায়িত্ব পালন করেন। এবং এসব ডিজির কালেক্টর হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি । এখন সোহেলের অন্যতম কালেক্টর। ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুদুল হক এবং অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আব্দুল ওহাবও এরমধ্যে রয়েছেন। সরকারি ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হারুন-অর-রশীদের ব্র্যাক ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার একটি অ্যাকাউন্টে ইতিপূর্বে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ডিজি সোহেলের বদলি বাণিজ্যের টাকা জমা হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকউন্টটির নম্বর হলো- ১৫৪৭১০৫০৮২৮৯১০০১। একজন সাবেক শিক্ষক নেতা শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ প্রতিবেদককে এ তথ্য জানিয়েছেন। এই অ্যাকাউন্টটির কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এই শিক্ষক নেতা নিজেও সোহেলের বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেটে যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, শুধু এই একটি ব্যাংক হিসাবই নয়, এ রকমের আরও অনেকগুলো ব্যাংক হিসাবে সোহেলের বদলি বাণিজের ঘুষ লেনদেন হয়ে থাকে। সিন্ডিকেটের সারাদেশের সদস্যরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই টাকা পাঠান। ব্যাংকে টাকা জমা হওয়ার পরেই কাক্সিক্ষত পদায়নের আদেশ জারি করা হয়। বেনামী এসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো কোনোটিই ড. সোহেল বেশিদিন ব্যবহার করেন না। দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যদের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে তা নিজের ঘুষ লেনদেনের কাজে ব্যবহার করেন।
শিক্ষক সমিতির সাবেক ওই নেতা জানিয়েছেন, তিনি নিজেও ড. সোহেলকে বদলি বাণিজ্যের অনেক টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছেন। গত বছরের ১২ জানুয়ারি ১৩ জন শিক্ষকের পদায়নের জন্য তিনি তখনকার পরিচালক (মাধ্যমিক) ড. খান মইনুদ্দিন সোহেলের ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে তালিকা পাঠান। কিন্তু তালিকার ৮ জনের বদলির আদেশ জারি হলেও বাকি ৫ জনের পদায়ন হয়নি। অথচ ড. সোহেল এ বাবদ অগ্রিম টাকা নিয়েছেন। টাকাও ফেরত দেননি। পরে এ নিয়ে সোহেলের সঙ্গে পরিচালকের দপ্তরে তর্কাতর্কি পর্যন্ত হয়। সেই টাকা এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। সেই থেকে তিনি ড. সোহেলের হয়ে আর কাজ করছেন না বলে জানিয়েছেন।
শীর্ষনিউজ