দেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহ ধরে এই সংকটে শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চলমান গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কারখানার বিভিন্ন মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিল্প মালিকদের আর্থিক ক্ষতি।
সংকট তীব্র হওয়ার ফলে সক্ষমতার অর্ধেকও কারখানা চালানো যাচ্ছে না। অনেকে বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন, যারা উৎপাদনে আছেন তারা পুরো সময় কারখানা চালু রাখতে পারছেন না। এতে একদিকে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানি আয়।
উদ্যোক্তারা জানান, কারখানাগুলোতে অনুমোদিত লোড অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে পণ্যের মানও নষ্ট হচ্ছে বলে জানানÑ সংশ্লিষ্টরা। তারা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট থাকলেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও কাটছে না সংকট। শঙ্কার বিষয় হলো, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে সংকট: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলো। গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ একেবারে শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অনেক ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে, শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে। অনেক কারখানায় স্বাভাবিকভাবে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানোই সম্ভব হচ্ছে না। সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্প-কারখানার অবস্থাও একই রকম।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, গ্যাসের সমস্যা সমাধান হচ্ছেই না। সরকার কীভাবে শিল্পখাতকে সুরক্ষা দেবে তার সমাধান বের করা জরুরি। কোনো ফ্যাক্টরি বন্ধ করে সুরক্ষা হয় না। তাই একটা পলিসি বের করা উচিত। নতুন সরকার আসার আগেও আশ্বস্ত করেছে শিল্পখাতে গ্যাস সহায়তা দেবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে গ্যাস দিতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। সেজন্য এখন ব্যবসায়ীদের ঋণগুলোর দায়ও সরকারকে নেয়া উচিত।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, কাগজ, স্পিনিং, ডায়িং সহ অধিকাংশ রপ্তানিমুখী শিল্প গ্যাসনির্ভর। উদ্যোক্তারা বলছেন, সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে না। এতে ক্রয়াদেশ বাতিল, জরিমানা, বাজার হারানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, বর্তমানে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত শুধু গ্যাস সংকটেই নয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটও রয়েছে। এভাবে চললে প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। তিনি বলেন, শিল্প সচল না থাকলে সরকারের কর ও ভ্যাট আদায়ও কমে যাবে। তাই শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, দেশের বর্তমান গ্যাস সংকট নতুন কোনও সমস্যা নয়-এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক স্টিল মিল কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে, যেখানে অনেক কারখানা স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। গ্যাসের সংকট দীর্ঘ হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি- সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েকদিন ধরে তিতাসের গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে শিল্প-কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের সংকটে শিল্প উৎপাদন প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন কারখানামালিকরা।
এদিকে রোববার সচিবালয়ে জ্বালানি সংকট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানে দু’টি এফএসআরইউ রয়েছে। এই দু’টি এফএসআরইউ দিয়ে এর বেশি এলএনজি আমদানি করা সম্ভব নয়। ফলে রাতারাতি জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।