Image description

এসএসসি, এইচএসসিসহ সব ধরনের পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার। এর অংশ হিসেবে উত্তরপত্র মূল্যায়নকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ জন্য পাবলিক এক্সামিনেশন্স (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৮০ সংশোধন করা হবে। নতুন এ পদ্ধতিতে পরীক্ষার খাতা প্রথম দফায় শিক্ষকদের মূল্যায়নের পর দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক খাতা অন্য পরীক্ষক যাচাই করবেন। এতে ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর কমবেশি করার প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা থেকেই নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

নতুন এ পদ্ধতিতে আরও একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফল প্রকাশের পর খাতা চ্যালেঞ্জ করা হলে আর পুনর্নিরীক্ষা নয়; নতুন করে খাতা দেখা হবে। বর্তমান পদ্ধতিতে শুধু নম্বর দেখে যোগ করে দেওয়া হয়।  

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু সমকালকে বলেন, বর্তমানে ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীরা শুধু পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করতে পারেন। নতুন পদ্ধতিতে, খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করতে পারবেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় শুধু নম্বরগুলো যোগ করে দেখা হয়। অথবা দেখা হয়, সব প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেওয়া হয়েছে কিনা। নতুন ব্যবস্থায় পুরো খাতা নতুন করে দেখে নম্বর দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা থেকেই এই বিধান কার্যকর করা হবে। 

পরীক্ষকের দায়িত্ব মূল্যায়নেই শেষ নয়

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সমকালকে জানান, বর্তমান ব্যবস্থায় একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে বোর্ডে জমা দেওয়ার পর সেটি সাধারণত পুনরায় দেখা হয় না। ফলে মূল্যায়নে ভুল বা অবহেলা থাকলে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে না। নতুন ব্যবস্থায় সেই চিত্র বদলাবে।

বোর্ডে জমা পড়া উত্তরপত্র থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক খাতা নির্বাচন করা হবে। পরে বোর্ড মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা প্রধান পরীক্ষকরা সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করবেন। দুই মূল্যায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো নতুন পরীক্ষা নয়; বরং পরীক্ষকদের কাজের মান যাচাইয়ের একটি অভ্যন্তরীণ মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

আইনে যুক্ত হচ্ছে ‘মূল্যায়নে অবহেলা’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী, এতদিন যেখানে পাবলিক পরীক্ষা আইন মূলত প্রশ্ন ফাঁস, নকল বা পরীক্ষা পরিচালনার অনিয়মকে কেন্দ্র করে ছিল, সেখানে এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে দায়িত্বে অবহেলাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

অর্থাৎ, কোনো পরীক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে বা গাফিলতির কারণে শিক্ষার্থীর প্রাপ্য নম্বর কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিলে কিংবা মূল্যায়নের নীতিমালা লঙ্ঘন করলে তিনি শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই নয়, আইনি জটিলতারও মুখোমুখি হতে পারেন। 

কেন এ সিদ্ধান্ত

শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিবছর কিছু পরীক্ষক নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত উত্তরপত্র গ্রহণ করেন। অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক খাতা মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে মান বজায় থাকে না। কোথাও কোথাও শিক্ষকের বিরুদ্ধে অন্যের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়নের অভিযোগও রয়েছে। অতীতে নম্বর হেরফের, ওভার-মার্কিং, আন্ডার-মার্কিং এবং দায়িত্বে অবহেলার একাধিক ঘটনা শিক্ষা বোর্ডের নজরে এসেছে। এসব অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতেই নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অতিরিক্ত খাতা, তিন পরীক্ষককে শোকজ

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিয়ম ভঙ্গ করে অতিরিক্ত খাতা নেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে তিন পরীক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে একজন পরীক্ষকের সর্বোচ্চ ৩০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের কথা, সেখানে একজন পরীক্ষক ৯০০টি এবং দুজন ৪৫০টি করে খাতা নিয়েছেন। বোর্ড মনে করছে, এত বিপুল সংখ্যক উত্তরপত্র অল্প সময়ে মূল্যায়ন করলে গুণগত মান যথার্থ না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই তাদের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

পুনর্নিরীক্ষা নিয়ে প্রচলিত ধারণা

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করলেও অধিকাংশের ধারণা ভুল। বর্তমানে আইনে পুনর্নিরীক্ষায় উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়ন করা হয় না।

বিদ্যমান ব্যবস্থা অনুযায়ী শুধু পাঁচটি বিষয় দেখা হয়– কোনো প্রশ্নের নম্বর বাদ পড়েছে কিনা, নম্বর কাভার পৃষ্ঠায় তুলতে ভুল হয়েছে কিনা, যোগফলে ত্রুটি আছে কিনা, ওএমআর বৃত্ত পূরণে ভুল হয়েছে কিনা এবং নম্বর ট্যাবুলেশন শিটে সঠিকভাবে স্থানান্তর হয়েছে কিনা। অর্থাৎ, বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরীক্ষকের দেওয়া নম্বর যথার্থ কিনা, বেশি বা কম নম্বর দেওয়া হয়েছে কিনা– এসব বিষয় যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। সেজন্য আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

নতুন আইন কার্যকর হলে, পুনর্নিরীক্ষা ব্যবস্থাতেও আসবে পরিবর্তন। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে শুধু নম্বর গণনা নয়, উত্তরপত্রের প্রকৃত মূল্যায়নেও পুনর্বিবেচনার সুযোগ যুক্ত হতে পারে। তবে পরীক্ষার্থীদের সরাসরি উত্তরপত্র দেখানো হবে কিনা, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

কমছে খাতা, বাড়ছে পরীক্ষক

উত্তরপত্র মূল্যায়নের মানোন্নয়নে এবারের এসএসসি ও এইচএসসিতে পরীক্ষকের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রতি মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত উত্তরপত্রের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একজন পরীক্ষক আগের তুলনায় প্রতিটি খাতা মূল্যায়নে বেশি সময় দিতে পারবেন বলে মনে করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

একই সঙ্গে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় তথাকথিত ‘মানবিক নম্বর’, গ্রেস মার্ক বা শুধু পাস করানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীর লিখিত উত্তরের ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়া হয়েছে। তবে মূল্যায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী, আংশিক সঠিক উত্তরের ক্ষেত্রে আংশিক মূল্যায়ন যথারীতি থাকবে।

শিক্ষামন্ত্রী যা বললেন

সমকালের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, অতীতে একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে জমা দেওয়ার পর সেটি সাধারণত আর কেউ যাচাই করতেন না। ফলে মূল্যায়নে গাফিলতি, ওভার-মার্কিং (বেশি নম্বর) কিংবা আন্ডার-মার্কিং (কম নম্বর) ধরা পড়ত না। নতুন ব্যবস্থায় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাজের মান যাচাই করা হবে। এতে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য– একজন পরীক্ষার্থীও যেন তার প্রাপ্য নম্বর থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয় এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একটি কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্য

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, অতীতে কিছু উদ্বেগজনক ঘটনার কারণে উত্তরপত্র মূল্যায়নে নতুন নজরদারি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নে যদি প্রথম ও দ্বিতীয় মূল্যায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ দায়িত্বে অবহেলাকারী পরীক্ষকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নের মান উন্নত হবে।