পায়রা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) সুবিধা সম্পন্ন আধুনিক সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই শুধু পরামর্শক (কনসালটেন্সি) সেবার জন্য প্রস্তাব করায় এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, আধুনিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিচালনার জন্য পায়রা বন্দরে আইসিটি-ভিত্তিক পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা সমন্বয় প্রকল্পে মোট ১৭৫ কোটি টাকার মধ্যে ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে ১৮৮ জন বা মাসের পরামর্শক সেবার জন্য। এতে প্রতিজন পরামর্শকের গড় মাসিক পারিশ্রমিক দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য আইসিটি অবকাঠামো ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হলেও পরামর্শক ব্যয়ের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এজন্য কোন ধরনের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হবে, তাদের দায়িত্ব কী হবে, কতদিন কাজ করবেন এবং এ ব্যয় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে। শুধু পরামর্শক ব্যয়ই নয়, প্রকল্পের আরেকটি বড় অংশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। ডিপিপি অনুযায়ী, আইসিটি সরঞ্জাম খাতে ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং কম্পিউটার ও সফটওয়্যার খাতে আরও ২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্লক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ১২৩ কোটি টাকারও বেশি নির্দিষ্ট আইটেমভিত্তিক ব্যয় দেখানো হয়নি।
কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, এত বড় অঙ্কের ব্লক বরাদ্দ গ্রহণযোগ্য নয়। তারা প্রতিটি কম্পিউটার, সফটওয়্যার, আইসিটি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জামের পৃথক ব্যয় বিবরণী চেয়েছেন। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ ভ্রমণ, সম্মানী, অফিস পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যয় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অফিস ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন নতুন করে অফিস ভাড়া, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সম্পদ কেনার জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ডিজিটাল পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা কী হবে, সেটিও জানতে চাওয়া হবে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও), সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে জীবনের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চুক্তি (সোলাস), আইএসও এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফ্রেমওয়ার্ক-আইটিআইএল মানদণ্ড অনুসারে বন্দর পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এর আওতায় পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম, টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সেবা চালু করা হবে। সরকারের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়বে, বড় জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হবে এবং জাহাজের অবস্থানকাল (টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম) কমে আসবে। ডিপিপির তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে সমুদ্রপথে বছরে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টন পণ্য পরিবহন হয় এবং প্রতি বছর এ প্রবাহ গড়ে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রকল্পের লক্ষ্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি খাতের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করেই প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।