Image description

সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে সিন্ডিকেট বাণিজ্য। সৌর বিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়ম, সীমিত প্রতিযোগিতা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অশুভ প্রভাবের কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। পতিত সরকার বিদায় হলেও তাদের সময়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠানটিতে এখন বহাল তবিয়তে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইডকলের সংস্কার না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র মতে ইডকল একটি সরকারি মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে অর্থায়ন ও সহায়তা প্রদানই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য। দেশের টেকসই জ্বালানি উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও নানা অভিযোগে এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে সংস্থাটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌর বিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়ম, সীমিত প্রতিযোগিতা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অশুভ প্রভাবের কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের নির্ধারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহ নিয়ে ইডকলে এলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন। ওই সিন্ডিকেটের কারণে খেলাপি বাড়ছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে। এখানে এক-দুইটি প্রতিষ্ঠানই ৮০ শতাংশ কাজ করছে বলে জানান তারা। কোনো উদ্যোক্তা প্রকল্প নিয়ে গেলেই তাকে নির্দিষ্ট কিছু ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করা হয়। সিন্ডিকেটের পছন্দের ঠিকাদার না হলেই শুরু হয় নানা টালবাহানা।

এই সিন্ডিকেট কার্যত প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি ‘অদৃশ্য ক্ষমতা কাঠামো’ হিসেবে কাজ করছে। নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া কঠিন- এমন অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ওই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘হেড অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ পদে দায়িত্বে থাকা এনামুল করিম পাভেল। যিনি পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার আত্মীয়। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইডকলে মহীরূহ হয়ে ওঠেন তিনি।
সরকারি মালিকানাধীন এ অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানে টানা ২২ বছর ধরে ‘হেড অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ পদে দায়িত্বে থাকার সুযোগে নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করে নিয়েছেন তিনি। যারাই তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন তাদের বিরুদ্ধেই নেমে এসেছে নির্যাতনের খড়গ। সিন্ডিকেটের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) নিয়োগ ছাড়া প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া কঠিন।

ইডকলে সক্রিয় সিন্ডিকেটের পছন্দের সেই প্রতিষ্ঠান হচ্ছে স্কিউব টেকনোলজিস লিমিটেড। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প নির্বাচন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ নেতার ঘনিষ্ঠ ওই প্রতিষ্ঠানটিকে ধারাবাহিকভাবে কাজ পাইয়ে দেয়া হচ্ছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩০১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৭৬টি রুফটপ সোলার প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৩টি প্রকল্পে ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে স্কিউব, যা মোট অনুমোদিত সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত রুফটপ সোলার প্রকল্পের ৪১ শতাংশেরও বেশি কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকার পরিবর্তনের পর স্কিউবের প্রভাব কিছুটা কমলেও তাদের দাপট থেমে নেই। খাতসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দেশে প্রায় দুই শতাধিক ইপিসি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সীমিত কয়েকটি কোম্পানির হাতে অধিকাংশ কাজ কেন কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

স্কিউব টেকনোলজিসকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাবেক এক মন্ত্রীর আত্মীয়। বিতর্কিত সাবেক এক ভিসি’র আপন ভাই। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইডকলে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করে জিম্মি করে রেখেছেন।
অর্থায়ন করার ক্ষেত্রে সকল নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আইই (স্বাধীন প্রকৌশলী বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার) নিয়োগ ছাড়াই ৬৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া, মেগারুফ লিমিটেডের একটি রুফটপ সোলার প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও গুরুতর বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা কেএফডব্লিউয়ের অর্থায়নে পরিচালিত শিল্প ও বাণিজ্যিক সোলার প্রকল্পে স্বাধীন প্রকৌশলী নিয়োগ বাধ্যতামূলক শর্ত। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান মেগারুফ লিমিটেডের কর্ণধারকে একই প্রকল্পে আইই হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের হোতার প্রত্যক্ষ মদতে একই প্রতিষ্ঠানকে একদিকে ঋণগ্রহীতা, অন্যদিকে স্বাধীন প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার শর্ত লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন সব ভুয়া বন্ধকীর বিপরীতে ঋণ দেয়া হয়েছে। যেগুলো কোনোদিনই আদায় হওয়ার সুযোগ নেই। এতে করে ক্লাসিফাইড ঋণের হার উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলছে। ইতিমধ্যেই অটবি, ক্লিকবিডিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন (আদায় অযোগ্য) করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্লাসিফাইড ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১.৯৮ শতাংশে।

ইডকলে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মন্ত্রণালয় থেকে ডেপুটেশনে আসা পাভেল ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। রুফটপ সোলার প্রকল্প বরাদ্দে স্কিউবকে অগ্রাধিকার দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করা হতো। স্কিউব কাজ না পেলে কিছু ক্ষেত্রে অর্থায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার নজির রয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানোর বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকার পাহাড় গড়েছেন এনামুল কবির পাভেল।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি এসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, ইডকলে কাজ পায় হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এতে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না। ইডকলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ঘুরেফিরে তারাই কাজ পায়। যারা প্রাপ্ততার যোগ্য তারা পাচ্ছে না। এতে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না। দেখা যায়, এক-দুইটি প্রতিষ্ঠানই ৮০ শতাংশ কাজ করছে। ইডকলের সংস্কার না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তবে আন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় থেকে এবং নতুন সরকার আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনে দুই শতাধিক সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে দেড় শতাধিক সরাসরি সৌর বিদ্যুৎ খাতে কাজ করে।

‘হেড অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ পদের দায়িত্বে থাকা এনামুল করিম পাভেলের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে অফিসের ল্যান্ড ফোন এবং মোবাইলে কয়েকবার কল দিলেও ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি মোবাইলে মেসেজ দিলেও কোনো সাড়া দেননি।

তবে ইডকলের সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলমগীর মোর্শেদ তার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মানবজমিনকে বলেন, যে ধরনের অভিযোগ এসেছে, সেগুলো আমরা অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করে দেখছি। বিষয়গুলো আমরা সিরিয়াসলি (গুরুত্বসহকারে) দেখি। এখানে (ইডকলে) চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স আছে। কেউ চাইলে কিছু করতে পারবে না। অবশ্যই নজরে এলে তা তদন্ত করা হচ্ছে। ঋণ একজনের কাছে যাচ্ছে কি-না তাও গভীরভাবে দেখা হয়। অনেক যাচাই-বাছাই করা হয়। তিনটি স্তরে তা দেখা হয়। স্তরগুলো পার করলে সব ঠিক আছে মর্মে বোর্ডের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। বোর্ড অনুমোদন দিলেই ঋণ ছাড় দেয়া হয়। এসব টাকা ডোনার এজেন্সির (উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার)। সুতরাং খুব গুরুত্ব দিয়ে সব দেখা হয়। তিনি আরও জানান, তারা আপাতত শিল্পের রুফটপে সোলারের জন্য ঋণ দিচ্ছেন। বাসা-বাড়িতে দিচ্ছেন না। দু’বছরে ৩০০ মেগাওয়াটের জন্য কিছু ঋণ দেয়া হয়েছে এবং আরও কিছু দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।