Image description

যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় প্রকাশ্যে যাওয়া-আসা করেছেন এক শীর্ষ মাদক কারবারি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মনোয়ারুল হাসান রাসেল ওরফে ‘চিট রাসেল’ নামের ওই ব্যক্তিকে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের একটি আদালত যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

আদালতের রায়ের দিন রাসেল উপস্থিত ছিলেন না। ফলে আদালত তাকে দণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর তিনি আত্মসমর্পণ করেননি, আদালত থেকেও জামিন নেননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে গত ১৯ জুলাই তিনি গোদাগাড়ী থানায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। রাসেলের বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার আঁচুয়া তালতলা গ্রামে।

 

আদালতের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় ২০১৯ সালে দায়ের হওয়া মাদক মামলার রায় ঘোষণা করা হয় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। ওই মামলায় রাসেল ছাড়াও জামাল উদ্দিন নামে আরেক ব্যক্তি আসামি ছিলেন। রায়ের দিন জামাল আদালতে উপস্থিত থাকলেও রাসেল পলাতক ছিলেন।

 

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৪-এর বিচারক আফরোজা জেসমিন কলি রাসেলকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। একই মামলায় জামাল উদ্দিনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

 

পুলিশ সূত্র জানায়, কোনো ব্যক্তি পলাতক অবস্থায় দেশের যেকোনো আদালতে দণ্ডিত হলে তার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়। বর্তমানে গোদাগাড়ী থানায় সাজাপ্রাপ্ত মামলার ওয়ারেন্ট তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম। আর বিচারাধীন মামলার ওয়ারেন্ট দেখভাল করেন এসআই নাজমুল ইসলাম।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসআই নাজমুল ইসলাম ১৯ জুলাই ঢাকার পল্টন থানার একটি বিচারাধীন মামলায় রাসেলের জামিনের কাগজ গ্রহণ করেন। তবে চট্টগ্রামের সাজাপ্রাপ্ত মামলার কোনো জামিনের কাগজ থানায় আসেনি। এরপরও রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ৮ জুলাই আঁচুয়া তালতলা গ্রামে রাসেলের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১১ জুলাই তার ভাতিজা রাকিবুর হাসান বাদী হয়ে গোদাগাড়ী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আসামিরা রিমান্ডে থাকা অবস্থায় ১৯ জুলাই থানায় যান রাসেল। সেখানে তিনি চুরির মামলার অগ্রগতি নিয়ে ওসি আতিকুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেন এবং একই দিনে পল্টন থানার মামলার জামিনের কাগজ জমা দেন।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, আমার বিষয়টি মনে পড়ছে না।

 

ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই নাজমুল ইসলাম বলেন, আমি বিচারাধীন মামলার ওয়ারেন্ট দেখি। রাসেলের বিরুদ্ধে পল্টন থানার একটি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ১৯ জুলাই ওই মামলার জামিনের কাগজ পেয়েছি। সাজাপ্রাপ্ত মামলার বিষয়টি জানি না। সেটি এসআই নুরুল ইসলাম দেখেন।

 

এ বিষয়ে এসআই নুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এগুলো অফিসিয়াল বিষয়। আমি এ নিয়ে কোনো তথ্য দিতে পারব না, কথাও বলব না।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করতেন রাসেল। এলাকায় তিনি ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের আদালতের রায়ের নথিতেও তার এই নাম উল্লেখ রয়েছে। পরে হেরোইন ও ইয়াবা ব্যাবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন তিনি। রাজশাহী শহরে তার বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট, জমিসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

 

এর আগে একাধিকবার মাদকসহ গ্রেপ্তারও হয়েছেন রাসেল। ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর রাতে রাজশাহী নগরের উপশহর এলাকায় তার ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৮৮০ পিস ইয়াবাসহ তাকে ও তার স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরও আগে ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানার এলাকায় প্রায় ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ও একটি ট্রাকসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।

 

স্থানীয়দের দাবি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও রাসেল প্রকাশ্যে রাজশাহী শহর ও গোদাগাড়ীতে চলাফেরা করছেন। বেশিরভাগ সময় তিনি রাজশাহী শহরের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন, মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়িতেও যান। তবে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। শুক্রবার সন্ধ্যায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

 

গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, গোদাগাড়ীর মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক প্রভাবশালী। বিপুল অর্থের প্রভাবে তারা নানা বিষয় ম্যানেজ করে। এ কারণে অনেক সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও কার্যকর হয় না।

 

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গোদাগাড়ীর কয়েকজন মাদক কারবারির অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চলছে এবং আদালতের নির্দেশে দুজনের সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। রাসেলের সম্পদেরও অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।