জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা ও বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে কুখ্যাত অপরাধী চক্রগুলো আবার নিজেদের আস্তানা দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন দেশজুড়ে ১৭টি কারাগারে একযোগে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুযোগে দুর্ধর্ষ সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিসহ অন্তত দুই হাজার ২০০ কয়েদি জেল ভেঙে পালিয়ে যায়।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়াদের মধ্যে ১১ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং ৭০ জন দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিসহ প্রায় ৭০০ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে আদালত থেকে জামিন পাওয়া আরও ১৭৪ জন সন্ত্রাসী। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এদেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় কারা কর্তৃপক্ষ।
তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ অপরাধ জগতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন থানা থেকে পাঁচ হাজার৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি গুলি লুট হয়। পুলিশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করতে পারলেও এক হাজার ৪১৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখ ৬৩ হাজারেরও বেশি গুলি এখনো নিখোঁজ।
গোয়েন্দাদের মতে, এই বিশাল অস্ত্রের বহর সরাসরি অপরাধী চক্রগুলোর হাতে চলে গেছে, যা পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী করে তুলেছে।
রাস্তায় পুরোনো নামগুলোর প্রত্যাবর্তন
আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো কুখ্যাত সব নাম আবার প্রকাশ্যে আসায় সংগঠিত অপরাধ বেড়ে যাওয়ার ভয় তৈরি হয়েছে। ২০০১ সালে সরকারের তালিকাভুক্ত ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অন্তত ১১ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, পিচ্চি হেলাল, ইমন, টিটন ও ফ্রিডম রাসুর মতো মারাত্মক সব অপরাধী।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ এ বিষয়ে জানান, আদালত জামিন দিলে পুলিশ কাউকে আটকে রাখতে পারে না।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আসল বিপদ হলো মুক্তির পর এদের ওপর কোনো তদারকি না থাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, জামিনে মুক্তি পাওয়া আইনি নিয়ম হলেও তারা যেন বাইরে এসে আবার অপরাধের জাল বুনতে না পারে, সে জন্য কড়া নজরদারি রাখা জরুরি ছিল।
নজরদারির ঘাটতিতে নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের সুযোগ
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবসময়ই কড়া নজর থাকে। কারণ, এরা জেলখানায় বসেও মোবাইলে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট চালাত। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই নজরদারি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আর সেই সুযোগেই সম্প্রতি জামিনে বের হওয়া সন্ত্রাসীরা দ্রুত নিজেদের পুরোনো সাম্রাজ্য গুছিয়ে নিতে শুরু করে।
এই সময়ে প্রকাশ্যে আসা সন্ত্রাসীদের মধ্যে সুব্রত বাইন ছিলেন অন্যতম। ৫ আগস্টের পরপরই দলবল নিয়ে মগবাজারের বিশাল সেন্টারে তার উপস্থিতি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সেপ্টেম্বরের শেষে একটি দোকান দখলের বিবাদ মেটাতে মধ্যস্থতা করেন তিনি। এরপরই তার ক্যাডাররা মগবাজার, মালিবাগ, ইস্কাটন, রমনা ও কাকরাইলে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। পরে সুব্রত বাইন আবার গ্রেফতার হলেও তার নেটওয়ার্ক নিয়ে আতঙ্ক কাটেনি।
চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইয়ের প্রত্যাবর্তন
জেল থেকে বের হয়েই সন্ত্রাসীরা নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাঁদাবাজি ও গ্যাং কালচার শুরু করে দেয়। এলিফ্যান্ট রোডে দুই ব্যবসায়ীর ওপর হামলার পর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও পিচ্চি হেলালের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই মারাত্মক রূপ নেয়।
গোয়েন্দাদের তদন্তে উঠে এসেছে, নিউ মার্কেট গণশৌচাগারের ইজারা ছিনতাই, হাতিরঝিলের নির্মাণ কাজে ভাগ বসানো, মহানগর প্রজেক্টে জমি দখল, ধানমন্ডি-জিগাতলার সহিংসতা এবং দীপ্ত টিভির কর্মকর্তা তানজিল জাহান ইসলাম তামিম হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইমনের বাহিনীর হাত ছিল।
অন্যদিকে, প্রায় দুই দশক পর জেল থেকে বেরিয়েই নতুন একটি হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন পিচ্চি হেলাল।
এদিকে মিরপুরে নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন অন্তত ২৭ মামলার আসামি ‘ডি ব্লক’ মামুন। তিনি বিদেশে বসেই ফোন করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার লোকজনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে পোশাক খাতের ঝুট ব্যবসা।
একইভাবে ২২টি মামলার আসামি কুখ্যাত ভাড়াটে খুনি সুইডেন আসলাম জামিনে বের হয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোয় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এলাকার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
সহিংসতায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
গত ২৮ এপ্রিল আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন খুন হওয়ার পর আন্ডারওয়ার্ল্ড সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এতে নগরবাসীর মনে ৯০-এর দশকের রক্তক্ষয়ী গ্যাং কালচারের ভয়াবহ স্মৃতি ফিরে এসেছে।
গত ২১ মাসের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্যাংস্টারদের নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৭টি বড় ধরনের খুনের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে ছয়টিই ঘটেছে চলন্ত গাড়ি বা বাইক থেকে গুলি চালিয়ে এবং একটি ঘটেছে কুপিয়ে। নিহতদের সবাই কোনো না কোনো অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
একইভাবে মিরপুরের পল্লবীতে মামুন ও মুসা গ্রুপের বিরোধের জেরে খুন হন মনজুরুল ইসলাম বাবু। আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রায়েরবাজারের সাদেক খান আড়ত এলাকায় চাঁদাবাজির রুট দখল নিয়ে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে।
তদন্তকারীদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন বিদেশে লুকিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তারা বিদেশ থেকে নির্দেশ দেয়, আর দেশে থাকা গ্যাং সদস্যরা তা বাস্তবায়ন করে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী তৌহিদুল হকের মতে, শুধু দু-একজন গ্যাং লিডারকে গ্রেপ্তার করে এই সমস্যা মেটানো যাবে না। স্থায়ী সমাধান চাইলে অপরাধীদের পেছনের ক্ষমতার উৎস ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে অপরাধীদের ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতা ছাড়তে হবে।
তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থবিরতা, সহজে জামিন পাওয়া, নজরদারির অভাব এবং ক্ষমতার শূন্যতাই আন্ডারওয়ার্ল্ড আবার জেগে ওঠার প্রধান কারণ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরকালীন সময়ের সুযোগ নিয়ে আসামিপক্ষের আইনি লড়াইয়ের কারণে আদালত জামিন দিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ এই পরিস্থিতিকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন। তার মতে, ৫ আগস্টের পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা-শূন্যতার সুযোগ আন্ডারওয়ার্ল্ড পুরোদমে কাজে লাগিয়েছে। তিনি মনে করেন, সরকারের সঠিক পদক্ষেপের অভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।