ডা. ইলা জাহান নদী। বহুল সমালোচিত জাজ মাল্টিমিডিয়ার আর্ট ডিরেক্টর। হাসিনার আমলে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রযোজক পরিবেশক সমিতির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি চিকিৎসক, কথাসাহিত্যিক ও কবি।
১৩ জুলাই ২০২৬। সকাল সাড়ে ১০টা। নদীর মগবাজারের বাসায় যান সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলাম ও তরুণী মরিয়ম খাতুন। সেখানে তারা বিকাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। বাসার একটি কক্ষে তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে ইলা জাহান নদীর ম্যানেজার হাসান।
গতকাল ২০ জুলাই রাতে এ ভিডিও ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রচার করা হয়।
ভিডিওটি প্রকাশের পর এমপি নজরুল ইসলাম জানান, ভিডিওটি ১৩ জুলাই ধারণকৃত এবং এটি প্রকাশে জড়িত তার গাড়ি চালক ওবায়দুল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে লেখা এক আবেদনপত্রে ওবায়দুল্লাহ জানায় তার আসল নাম হলো ওবায়দুর রহমান।
সে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের গাড়ী চালক ও ব্যাক্তিগত সহকারী ছিল।
তার বর্ণনা অনুযায়ী এমপি নজরুল ১৭ বছরের এক মেয়েকে নিয়ে গত ১৩ জুলাই "বেলা ১০:৩০ থেকে বিকেল পর্যন্ত মগবাজারে অবস্থিত ইলা জাহান নদী নামের একটি মহিলার বাসায় অসামাজিক কাজ করে। যা গোপনে ভিডিও করে ইলা জাহানের ম্যানেজার হাসান।"
তবে ওবায়দুল্লাহ আবেদনপত্রে উল্লেখ করেনি, '১৭ বছরের' ওই তরুণী হলো মরিয়ম খাতুন। তারা সম্পর্কে মামা ও ভাগ্নী।
মরিয়মের মা কাকলী ও ওবায়দুর রহমান আপন ভাই ও বোন। রাজধানীর পল্লবী থানার উত্তর কালশীর আলীনগরে অবস্থিত রোজ গার্ডেন টাওয়ারেই উভয়ের বর্তমান নিবাস।
ওবায়দুর গাড়ি চালক হওয়ায় এমপি গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কাকলী-মো. মাসুম বিল্লাহ দম্পতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।
এ বছরই এ দম্পতির কন্যা মরিয়মের সঙ্গে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়।
বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, গত ১৭জুন তার মেয়ের সঙ্গে এমপির বিয়ে হয়েছে।
একই তথ্য জানিয়েছে, এমপি নজরুলের প্রথম পক্ষের স্ত্রী মাকসুদা ইসলামও।
ভিডিও প্রকাশের পর এমপি নজরুল এক বিবৃতিতে জানান, গত ১৩ জুলাই তিনি প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর মগবাজারের অফিসে যান।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ১৩ জুলাই তিনি দুই স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে অবস্থানকালে তার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা বাইরে থেকে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। তারা সেখানে তাকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করেন এবং পরে আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।
গাজী নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা তাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন এবং তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন।
তখন সঙ্গে ছিল এমপির গাড়িচালক ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ।
এমপি নজরুলের দাবি, ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে মাসুম বিল পারিবারিক শত্রুতা ও বিরোধ ছিল। এর জের ধরে সে এমপি নজরুল ইসলাম ও ভাগ্নি মরিয়মের ভিডিও ধারণ ও ফাঁসানোর সঙ্গে জড়িত হয়।
এ ঘটনার পর ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে ওবায়দুল্লাহকে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ ও চাচা মুস্তাসিম বিল্লাহ মারধর করে বলে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা আবেদনপত্রে জানানো হয়।
তবে এ মারধরের পরেও ধারণকৃত ভিডিও ইস্যুর সুরাহা হয়নি। এমপি নজরুল ইসলাম তার ভাড়া করা গাড়িও ফেরত পাননি।
এরমধ্যো ২০ জুলাই রাতে টাইমস্ট্যাম্পে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ধারণ করা লিখে এমপি নজরুল ও মরিয়ম খাতুনের ১৩ জুলাইয়ের মগবাজারের ভিডিও প্রচার করা হয়।
২৩ সালের তারিখের কারণে শুরুতেই এমপি নজরুল ইসলাম সাইবার ক্রাইম ভিক্টিমের পরিবর্তে চারিত্রিক স্থলনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে পড়েন।
আর ভিডিওটিকে জামায়াত-শিবিরের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা গয়রহভাবে এআই নির্মিত দাবি করতে গিয়ে ভিক্টিম নজরুল ইসলাম ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগমের ব্যাখ্যাকে জনমনে আগাম অবিশ্বাস্য করে তোলে।
তবে ঘটনার নেপথ্যের অপরাধীরাই ফাঁস করে দেয় কিভাবে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে।
প্রথমে মিথ্যা টাইমস্ট্যাম্প যোগ করে ছড়ানো ভিডিওকে সত্য প্রমাণ করতে অপরাধীরা আরেকটি ভিডিও ছাড়ে। তাতে দেখা যায় ভিডিও আসলে ২০২৬ সালেই ধারণ করা।
আর প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো আবেদনপত্রে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী
ভিডিওটি চলতি জুলাই মাসের ১৩ তারিখেরই।
ভাইরাল দুটি ভিডিওর দ্বিতীয়টিতে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য কার্ড দেখা যায়। এতে প্রমাণিত হয় ভিডিওটি চলতি বছরের নির্বাচনের পর তোলা।
আর দুটি ভিডিওতে দেখা যাওয়া এমপি নজরুল ইসলাম এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পোশাক, বিছানার চাদর, বালিশ ও ঘরের আসবাবপত্রের অবস্থান ইত্যাদিতে হুবহু মিল রয়েছে৷
দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখা যায়, একাধিক ব্যক্তি প্রথম ভিডিওতে দেখা যাওয়া রুমে প্রবেশ করে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এবং মরিয়ম খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
ভিডিওতে একাধিক লোককে এমপির স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে বলতে শোনা যায়, দেখেন সাতক্ষীরা জামাতের লোক মেয়ে সহ এখানে ধরা খাইছে… আপনার বাসা হইলো মিরপুর।
রুমে হানা দেওয়া অপরাধীরা জামায়াতের এমপিকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে, আপনি চাকরি দেওয়ার কথা বলে আনছেন না?
পরে একাধিক অপরাধী এমপির স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে জিজ্ঞাসা করেছে তাকে চাকরির কথা বলে এখানে আনা হয়েছে কিনা?
বারবার প্রশ্ন করা হলেও এমপির স্ত্রী মরিয়ম খাতুন নীরব ছিলেন।
ভিডিওর শেষে এমপিকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ঐ নারীকে আনার ব্যাপারে বারবার জিজ্ঞেস করা হলে তাকে বলতে শোনা যায়, ওর আব্বা বলছিলো চাকরি দেওয়া যায়।
এ দ্বিতীয় ভিডিওতে স্পষ্ট যে রুমে হানা দেওয়া অপরাধী চক্র ভিডিওতে একটি পরিকল্পিত ভাষ্য ধারণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিকল্পিত ভাষ্যটি হলো, সাতক্ষীরার এমপি নজরুল ঢাকার মিরপুরের অল্প বয়সী একজন নারীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মগবাজার এনে অসামাজিক কার্যকলাপ করেছেন।
তবে পুরো ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘটনার পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের মান ব্যক্তিগত শত্রুতার চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
পুরো ঘটনার ধাপে ধাপে রয়েছে পেশাদারিত্ব ও গভীর বুদ্ধিমত্তার ছাপ। যেন এটি সাজানো হয়েছে জামায়াতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
এ প্রচারণার জবাবে জামায়াতপন্থীরা তাদের এমপির ও দ্বিতীয় স্ত্রীর বেডরুমের ভিডিও ধারণ নিয়ে যেন বলতে না পারে সে জন্য প্রথম ভিডিওর তারিখ লেখা হয়েছে ২০২৩ সাল।
এই ২৩ সাল দেখিয়ে প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের অনুমতিতে এমপি নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় বিয়ে করার তথ্যকেও নাকচ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মাকসুদা দ্বিতীয় বিয়েতে এমপির পক্ষে সাক্ষীও হয়েছেন। তিনি ভিডিও বার্তায় তার স্বামীর নামে রটানো কুৎসার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
এমপি নজরুলকে শিকার করে চরিত্র হননের ঘটনায় সরকারি দল বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ সমর্থকদেরও চোখে পড়ার মতো উল্লাস করতে দেখা গেছে।
তবে ঘটনার ধাপে ধাপে থাকা পেশাদারিত্ব ও গভীর বুদ্ধিমত্তা ইঙ্গিত করে নেপথ্যে থেকে কেউ শিকার করছে।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর ওবায়দুর রহমান ওরফে ওবায়দুল্লাহর আবেদন পত্রটি কম্পিউটারে টাইপ করা, যার শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠন লক্ষনীয়। আবেদনপত্রে ওবায়দুল্লাহর যে স্বাক্ষর রয়েছে তা দেখে এটি মনে করার সুযোগ আছে আবেদন পত্রটি অন্য কারো লিখে দেওয়া।
এরমধ্যে পুরো ঘটনায় হাসিনা আমলের বহুল সমালোচিত ও বিতর্কিত জজ মাল্টিমিডিয়ার আর্ট ডিরেক্টর ডা. ইলা জাহান নদীর বিষয়টি গুরুতর।
ওবায়দুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী নদীর অফিসে তার ম্যানেজার ভিডিও ধারণ করে থাকলে এটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের কাজ হতে পারে। কারণ হাসিনা জমানায় হানিট্র্যাপের জন্য আলোচিত নায়িকা পরিমনী, মাহিয়া মাহী সহ অনেকেই জজ মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই জজ মাল্টিমিডিয়ার ডা. নদীর নাম জড়িয়ে যাওয়া ছোট ব্যাপার নয়।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক সমকাল, দ্য ডিসেন্ট-এর প্রতিবেদনের তথ্য সহায়তা নেওয়া হয়েছে]