নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও স্বাভাবিক হচ্ছে না বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। এখনো কাটছে না রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। মাঠপর্যায়ের শুল্ক স্টেশন থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী উচ্চপর্যায়-সবখানেই যেন দুই দেশের মধ্যে অনাস্থার অদৃশ্য দেয়াল! এই ‘অলিখিত’ বাধা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। বাংলাদেশে ভারতের বাণিজ্যে রীতিমতো ধস নেমেছে। গত পাঁচ বছরে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এ বাণিজ্য ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে গেছে। বাণিজ্য কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। অপরদিকে শুধু গত এক বছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুটি দেশের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলে যে ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার বড় প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের আমদানি-রপ্তানির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান।
এ পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, ভারত যেমন বাংলাদেশের মতো বড় বাজার হারাচ্ছে, তেমনই ভারতের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানি কমছে বাংলাদেশের। এখানে দেখতে হবে, এ বাণিজ্য হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি কতটা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই চিফ ইকোনমিস্ট বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করত রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে এখন তা বিকল্প গন্তব্য থেকে আনা হচ্ছে। বিকল্প দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে যদি ভারতের চেয়ে বেশি দাম দিতে হয় তবে বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়বে। দুয়েক বছরের পরিসংখ্যানে এ ক্ষতি খুব বেশি স্পষ্ট না হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাড়তি আমদানি ব্যয় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচও বাড়িয়ে দেবে। এখন পারস্পরিক স্বার্থেই রাজনীতিকে দূরে রেখে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিকশিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাণিজ্য ইস্যু নিয়ে গত ৪ বছর ধরে বৈঠক হয় না সচিব পর্যায়ের। সাড়ে ৩ বছর ধরে বাণিজ্য সম্পর্কিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক হচ্ছে না। দুই দেশের মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সেপা) চুক্তি এবং ভারত থেকে চাল, গম, পিঁয়াজ, ডালসহ নিত্যপণ্য আমদানিতে এমওইউ স্বাক্ষরের আলোচনাও অলিখিতভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে বর্ডার হাটের কার্যক্রম। স্থলবন্দর দিয়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে রয়েছে বিধিনিষেধ। এমনকি ভারতের বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রানশিপম্যান্ট সুবিধাও বাতিল হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে।
দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ভারতের অর্থবছরের হিসাব হয় ১ এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত। ফলে দেশটির শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় আমদানি-রপ্তানির যে চিত্র তা আসলে গত মার্চ পর্যন্ত এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের। বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর উভয়পক্ষ বাণিজ্য বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের রপ্তানি বেশি কমায় দুই দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি আগের চেয়ে কিছুটা কমে এসেছে বলে মনে করছেন আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালউদ্দিন শিমুল বলেন, ‘দুই বছর আগেও ভারতের বন্দর ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য রপ্তানিতে এ রুট ব্যবহার করতেন আমাদের গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ। এমনকি স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্লাস্টিক ও পাটসহ অন্যান্য দেশীয় পণ্য ভারতে রপ্তানিও নানান অজুহাতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে বাংলাদেশে কিছু গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেও ভারতের সুতা ও কাঁচামালের চাহিদা কিছুটা কমেছে।’
এ বিষয়ে নিট তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গত এক বছরে দেশে প্রায় ৪০০ গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া বেশির ভাগ কারখানাই ছিল ছোট ও মাঝারি আকারের, যাদের কাঁচামাল আমদানির প্রধান উৎস ছিল ভারত। ফলে এ কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমেছে। এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে যত দ্রুত সম্ভব দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের সচিব পর্যায়ে বসে টেবিল টক শুরু করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ককে রাজনীতির বাইরে রেখে স্বাভাবিক করা উচিত।’
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সাবেক উপ-উপাচার্য ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, দুই দেশের মধ্যে যে বাণিজ্য ঘাটতি আছে-সেটি কমানোর জন্য অবশ্যই আমাদের কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বাণিজ্যিক যে রূপান্তর ঘটেছে- সে জায়গাগুলোতে দরকষাকষি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা দেখেছি, দরকষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা রয়েছে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এ ছাড়া বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের যে অবকাঠামো ও লজিস্টিক সুবিধা সেখানেও দুর্বলতা আছে। এর ফলে ভারতসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের টেস্টিংসহ ছোট ছোট নানা ইস্যুতেও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেনাপোল দিয়ে পণ্য রপ্তানিতে টেস্টিং ছাড়পত্রে অনেক সময় লাগে। এসব অশুল্ক বাধা দূরীকরণেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, অর্থাৎ দরকষাকষিতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পাঁচ বছরে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের চিত্র
অর্থবছর বাংলাদেশে ভারতের ভারতে বাংলাদেশের বাংলাদেশের বাণিজ্য
(এপ্রিল-মার্চ) রপ্তানি রপ্তানি ঘাটতি
২০২১-২২ ১৬১৫৬ মিলিয়ন ডলার ১৯৭৭ মিলিয়ন ডলার ১৪১৭৯ মিলিয়ন ডলার
২০২২-২৩ ১২২১৫ মিলিয়ন ডলার ২০২১ মিলিয়ন ডলার ১০১৯৪ মিলিয়ন ডলার
২০২৩-২৪ ১১০৬৫ মিলিয়ন ডলার ১৮৪৪ মিলিয়ন ডলার ৯২২১ মিলিয়ন ডলার
২০২৪-২৫ ১১৪৮৫ মিলিয়ন ডলার ২০০৫ মিলিয়ন ডলার ৯৪৮০ মিলিয়ন ডলার
২০২৫-২৬ ১০৫৮৭ মিলিয়ন ডলার ১৭৮০ মিলিয়ন ডলার ৮৮০৭ মিলিয়ন ডলার
তথ্য : ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর