নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে, বর্তমান সরকারের ত্রয়োদশ মন্ত্রিসভার বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল এখনও প্রশাসনিক পর্যালোচনার বৃত্তেই আটকে আছে। চূড়ান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় এখনও ওঠেনি। প্রকাশ হয়নি গেজেট কিংবা বাস্তবায়ন নির্দেশনা। ফলে নতুন মূল বেতন কত হবে, কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, ভাতা একসঙ্গে নাকি ধাপে ধাপে মিলবে এবং পেনশনভোগীরা কতটা সুবিধা পাবেন—এসব প্রশ্নে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) পর্যন্ত নতুন বেতন স্কেল সংক্রান্ত কোনও গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিন বিকালে মন্ত্রিসভার বৈঠক হলেও সেখানে পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা, তার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পে-স্কেল বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে বা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, গেজেট হওয়ার আগে তা নিশ্চিত করে বলা ঠিক হবে না।’’ মন্ত্রিসভার ১৩তম বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা, সেটিও তার জানা নেই।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় জুলাই থেকে কার্যকারিতা, আগস্টে গেজেট এবং অক্টোবর থেকে বর্ধিত বেতন পাওয়ার মতো সম্ভাব্য সময়সূচি উঠে এসেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ ঘোষণা না হওয়ায় এসব সময়সীমাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চূড়ান্ত প্রস্তাব আটকে আছে কোথায়
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সচিব কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশ চূড়ান্ত করা। নতুন কাঠামোর সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয়, গ্রেডের সংখ্যা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বিভিন্ন ভাতা ও পেনশনের প্রভাব বিবেচনা করে সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে।
সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তা অর্থ বিভাগের যাচাই এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পরই গেজেট বা বাস্তবায়ন প্রজ্ঞাপন জারির পথ খুলবে। অর্থাৎ, পে-স্কেল কার্যকরের আগে এখনও একাধিক প্রশাসনিক ও নীতিগত ধাপ বাকি।
সরকারের জন্য বড় বিবেচনার বিষয় হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতা। মূল বেতন বাড়লে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ব্যয় নয়—বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, গ্র্যাচুইটি, অবসর-সুবিধা ও পেনশনের ব্যয়ও বাড়বে। স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন কাঠামো প্রয়োগ করা হলে সামগ্রিক ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।
এ কারণেই পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল একসঙ্গে কার্যকর করা হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে, সে প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সরকারের বিবেচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য পথ হলো—প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা পরে সমন্বয় করা। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি আদেশ জারি হয়নি।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে— প্রথম বছর সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। তবে কর্মচারীদের আশঙ্কা, শুধু মূল বেতন বাড়িয়ে ভাতা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত রাখা হলে নতুন পে-স্কেলের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বর্তমানে মূল বেতনের সঙ্গে দেওয়া বিশেষ সুবিধা নতুন কাঠামোয় বহাল থাকবে, মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বিত হবে, নাকি বাতিল হবে—এ বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। সাধারণত নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে অন্তর্বর্তী সুবিধা নতুন মূল বেতনের মধ্যে সমন্বয় করা হয়। তবে এবার কোন পদ্ধতি নেওয়া হবে, তা গেজেট ছাড়া নিশ্চিত নয়।
পেনশন ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি
নতুন পে-স্কেল নিয়ে কর্মরতদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। মূল বেতন বাড়লে পেনশন কতটা সমন্বয় হবে, সর্বনিম্ন পেনশন বাড়বে কিনা এবং পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের সুবিধার ব্যবধান কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয়ও চূড়ান্ত প্রস্তাবের অংশ হওয়ার কথা।
পেনশন ধাপে বাড়ানো এবং অপেক্ষাকৃত কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বেশি সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় এসেছে। তবে অর্থ বিভাগ এখনও কোনও নির্দিষ্ট হার বা সূত্র প্রকাশ করেনি। নতুন কাঠামো কার্যকরের আগে ও পরে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের সুবিধা সমন্বয়ের স্পষ্ট পদ্ধতি না থাকলে বৈষম্যের অভিযোগও উঠতে পারে।
পে-স্কেল বাস্তবায়ন বড় ধরনের প্রযুক্তিগত কাজও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, কর্তন, ভাতা, আয়কর ও পেনশনের হিসাব বর্তমানে সমন্বিত বাজেট ও হিসাবব্যবস্থা বা আইবিএএস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
নতুন গ্রেড ও মূল বেতন কার্যকর করতে সফটওয়্যারে নতুন বেতন ম্যাট্রিক্স যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান বেতন নতুন কাঠামো কোন ধাপে নির্ধারিত হবে, সেটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সার্ভিস রেকর্ড, পদ, গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টের তথ্য হালনাগাদ না থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনও আইবিএএস সার্কুলার বা সরকারি নির্দেশনা প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্টতা জানান, সরকার চাইলে গেজেট পরে প্রকাশ করেও আগের কোনও তারিখ থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর দেখাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সময়ের বকেয়া মূল বেতন বা অ্যারিয়ার পরিশোধ করতে হবে। তবে কার্যকর তারিখ, অ্যারিয়ার হিসাব এবং অর্থ ছাড়ের সময়সীমা—সবই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করতে হবে। ফলে ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর দেখানোর সম্ভাবনা আলোচনায় থাকলেও এখনও সেটিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত বলা যাচ্ছে না। গেজেটের আগে নতুন বেতন বা অ্যারিয়ারের হিসাবও চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়।
২০১৫ সালের বেতনকাঠামো কার্যকরের পর জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন পে-স্কেলকে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, হারানো ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের উপায় হিসেবেও দেখছেন।
তবে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও বাজেটের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গ্রহণযোগ্য বেতনকাঠামো নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা।
এখন নজর থাকবে তিনটি ধাপে—সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং গেজেট ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা। গেজেট জারি হলেই স্পষ্ট হবে নতুন গ্রেড, মূল বেতন, ভাতা, পেনশন, বিশেষ সুবিধা এবং কার্যকর তারিখের প্রকৃত চিত্র। তার আগে প্রচারিত অঙ্ক ও সময়সূচি সম্ভাবনা হিসেবেই বিবেচিত হবে।