দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মার্কিন ডলারের দাম। কয়েক সপ্তাহ স্থিতিশীল থাকার পর জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আন্তব্যাংক বাজার, ব্যাংকের খুচরা বিক্রি এবং খোলা বাজার—সব ক্ষেত্রেই ডলারের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়ছে, এলসি খোলার খরচও বেড়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার জন্য ডলার কিনতেও আগের তুলনায় বেশি টাকা গুনছেন।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এটি এখনই বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত নয়। বরং সরকারি বড় অঙ্কের আমদানি বিল ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ, ঈদ-পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্সের স্বাভাবিক ধীরগতি এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার সম্মিলিত প্রভাবেই ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের তুলনায় অর্থপাচার কমেছে, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে ডলারের বিনিময় হার কিছুটা কমার কথা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ডলারের বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সরকারকে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন অপরিহার্য পণ্যের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। এসব বিল নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডলার সংগ্রহ করতে হয়েছে, যার ফলে বাজারে ডলারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। চাহিদা বৃদ্ধির এই চাপই মূলত সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ।
কোথায় কত বাড়লো
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে গত সোমবার প্রতি ডলারের গড় দর দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। গত ২৪ জুন গড় দর ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। আর এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ১২২ টাকা ১ পয়সা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দাম প্রায় ১ টাকা বা ০.৮১ শতাংশ বেড়েছে। যদিও এই বৃদ্ধি খুব বেশি নয়, তবে কয়েক দিনের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়ার প্রবণতা বাজারে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
খোলা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম আরও বেশি। বর্তমানে সেখানে প্রতি ডলার ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কিনছেন ১২৬ টাকা ২০ পয়সা দরে। কয়েক দিন আগেও বিক্রিমূল্য ছিল ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা।
ব্যাংকগুলোতেও দাম বেড়েছে। বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক নগদ ডলার বিক্রি করছে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিক্রি করছে ১২৩ টাকা দরে। অন্যদিকে আমদানি এলসি খোলার ক্ষেত্রেও অধিকাংশ ব্যাংক ১২৪ টাকা পর্যন্ত ডলার বিক্রি করছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত অর্থবছরজুড়ে দেশের রফতানি আয়ে কিছুটা স্থবিরতা ও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় কমার পরিবর্তে বরং বেড়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও জটিলতা ধীরে ধীরে শিথিল হওয়ায় আমদানি কার্যক্রমও গতি পাচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার, বিশেষ করে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদা বৃদ্ধির এই চাপের কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
কেন বাড়ছে ডলারের দাম
বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে অন্তত পাঁচটি কারণে ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধ: সম্প্রতি সরকারকে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্যের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। এসব বিল মেটাতে ব্যাংকগুলোকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডলার সংগ্রহ করতে হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও বলেছেন, সরকারি কয়েকটি বড় পেমেন্টের কারণেই ডলারের চাহিদা বেড়েছে।
বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ: শুধু আমদানি বিল নয়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়। ফলে ব্যাংকগুলোকে বাজার থেকে অতিরিক্ত ডলার সংগ্রহ করতে হয়েছে।
রেমিট্যান্সে মৌসুমি ধীরগতি: ঈদুল আজহার আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। মে মাসে দেশে আসে প্রায় ৩.৪২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ঈদের পর জুনে তা কমে ২.৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
যদিও জুলাইয়ের প্রথম ১৩ দিনে আবারও ১৪২ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯.৫ শতাংশ বেশি, তবু জুনের ধীরগতির প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কম ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা বন্ধ: গত কয়েক মাস ধরে রিজার্ভ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত বাজার থেকে ডলার কিনছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা বন্ধ রেখেছে। এতে বোঝা যায়, বাজারে ডলারের সরবরাহ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বাস্তবায়নের প্রভাব: ব্যাংক খাতের অনেক কর্মকর্তার ধারণা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলার সময় সরকার ধীরে ধীরে ডলারের বিনিময় হারকে আরও বাজারমুখী হতে দিচ্ছে। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কৃত্রিমভাবে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ না করে বাজারের চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে ডলারের দাম নির্ধারণের পরামর্শ দিয়ে আসছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের ব্যাখ্যা নাকচ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে আইএমএফ সফরের কোনও সম্পর্ক নেই; এটি পুরোপুরি বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির ফল।
রিজার্ভ বাড়লেও চাপ কেন
অনেকের প্রশ্ন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন বেড়ে ৩৬.৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে (বিপিএম-৬ অনুযায়ী প্রায় ৩১.৯১ বিলিয়ন ডলার), তখনও ডলারের দাম কেন বাড়ছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিদিনের বাজারে ডলারের দাম নির্ধারণ হয় তাৎক্ষণিক চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। কোনও নির্দিষ্ট সময়ে যদি আমদানি বিল, ঋণ পরিশোধ বা এলসি নিষ্পত্তির জন্য চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, তাহলে রিজার্ভ বেশি থাকলেও বাজারে দাম বাড়তে পারে।
রফতানি আয়ের ধীরগতি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
ডলারের বাজারে আরেকটি চাপের কারণ রফতানি আয়। দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১.৬৪ শতাংশ রফতানি আয় হারিয়েছে। পোশাক শিল্প থেকেই দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে। ফলে এই খাতের আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে দেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৪.০২ বিলিয়ন ডলার, আর রফতানি হয়েছে ৪০.০৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে ১১ মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতিও ডলারের ওপর চাপ বাড়ায়।
সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়বে
ডলারের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও যন্ত্রপাতি আমদানির খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাজারে পণ্যমূল্যে পড়তে পারে।
এ ছাড়া বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের জন্য ডলার কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা ব্যয় করতে হবে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স পাঠানো পরিবারের জন্য এটি কিছুটা ইতিবাচক, কারণ একই পরিমাণ ডলারের বিপরীতে তারা বেশি টাকা পাবেন।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনই উদ্বেগজনক নয়। কারণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং জুলাইয়ের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স আবারও ঊর্ধ্বমুখী।
তবে বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে কয়েকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে—রফতানি আয় বাড়ানো, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হারকে বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সূচক ইতিবাচক থাকলে ডলারের বর্তমান চাপ সাময়িকই থাকবে। কিন্তু আমদানি ব্যয় যদি আরও বাড়ে, রফতানি আয় দুর্বল থাকে অথবা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ডলারের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।