Image description

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনা শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকেই নয়, বরং তার পুরো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘ভবিষ্যতে সমাজবিজ্ঞানীরা এ ঘটনাকে ‘দি গ্রেট মাইগ্রেশন অব ফ্যাসিস্ট’ নামে অভিহিত করতে পারেন।

আজ মঙ্গলবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক ফোরাম আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: সাম্প্রতিক ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন।

তাজুল ইসলামের ভাষ্য,‘হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাকে ১২০৩ সালে বখতিয়ার খলজির আগমনের সময় লক্ষণ সেনের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায়।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরেন তাজুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রব্যবস্থার অবক্ষয়, বাকশাল গঠন, রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী হত্যার ঘটনায় মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। মানুষের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। সে কারণেই এই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।’

গুমের ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বললেন, ‘অনেককে রাস্তা বা কর্মস্থল থেকে সাদা কিংবা কালো পোশাকধারীরা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যেত। এরপর তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো। বৈদ্যুতিক শক, ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত, আঙুলে সূচ ফোটানো, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক ও বিশেষ বৈদ্যুতিক চেয়ারে নির্যাতনের মতো অমানবিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো।’

অনেককে হত্যার পর মরদেহ গোপন করতে নদী বা সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম। বললেন, ‘বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা নিজেদের শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ মনে করতেন। ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্যাতনের বিষয়টি জেনেও রিমান্ড মঞ্জুর করতেন। শেখ হাসিনা মনে করতেন, তার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, একজন সাধারণ রিকশাচালকের ২২ বছর বয়সী ছেলেও দেশকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।’

সেমিনারে মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব জানালেন,‘জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরশাসনের অবসান। ছাত্র-জনতার ঐক্যের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য শতভাগ সফল হয়েছে। ১৬ বছর ধরে টিকে থাকা একটি স্বৈরশাসনের পতন কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বললেন, ‘সেই সময় তার কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি নিখুঁত নন। তার সরকারের ভুল থাকতে পারে। কিন্তু দেশের সব সমস্যার দায় তার ওপর চাপিয়ে স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার একটি বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।’

‘জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষ প্রতিবাদের ভাষা ফিরে পেয়েছে। স্বৈরাচারের ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্র ও আইনি সংস্কার। আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় দায়িত্ব পালন করেন।’—যোগ করেন তিনি।