নিজ দফতরে সেবা নিতে আসা এক ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষের টাকা গুনে গুনে নিচ্ছেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নুহু মিয়া। এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও ভাইরালের বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘ঘটনা সত্য। তবে কারা ভিডিও করেছে, তা জানা নেই।’
এদিকে নিজ দফতরে বসে প্রকাশ্যে এভাবে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও নিয়ে উপজেলাজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সেবাগ্রহীতা তার অফিস কক্ষের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নুহু মিয়াকে ঘুষের টাকা দেন। সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে ওই টাকা নিয়ে গুনে গুনে পকেটে রেখেছেন নুহু মিয়া।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওই সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিনিধি। উপজেলার এক স্কুলশিক্ষকের পেনশনের ফাইল আটকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন নুহু মিয়া। পরে আট হাজার টাকা দিলে প্রথমে নিতে রাজি হননি, শেষে বারবার অনুরোধ করার পর পেনশনের ফাইল অনুমোদন করে দেন। এ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ওই স্কুলশিক্ষক কোনও কথা বলতে রাজি হননি। শুধু বলেছেন, ‘সবার কাছ থেকেই ঘুষ নেন তিনি। কোনও কথা বললে পরে এ নিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হবো।’
ওই শিক্ষকের বক্তব্যের সূত্র ধরে নুহু মিয়ার দফতরে গিয়েও ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গুনে গুনে ঘুষের টাকা নেওয়ার পর ফাইলে স্বাক্ষর করতে দেখা গেছে তাকে। এ সময় এক সেবাগ্রহীতাকে বলেছেন, ‘আমার কাছে কারও বেইল নাই। কাজ করতে হলে ঘুষ দিতেই হবে। এক টাকাও কম দিলে কাজ হবে না।’
নুহু মিয়ার দফতরে বিভিন্ন কাজে আসা পাঁচ জন সেবাগ্রহীতা জানিয়েছেন, পেনশনের ফাইল, টিআর ও কাবিখা, সরকারি চাকরিজীবীদের ল্যাম্পগ্রান্ট, এলপিআরসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল নানা অজুহাতে আটকে রেখে ঘুষ দাবি করেন নুহু মিয়া। তার চাহিদামতো ঘুষ দিলে ফাইল অনুমোদন করেন।
এ সময় নুহু মিয়ার দফতরে বসে থাকতে দেখা যায় উপজেলার টেপামধুপুর থেকে আসা আকলিমা বেগমকে। আকলিমার স্কুলশিক্ষক স্বামীর পেনশনের ফাইল আটকে রেখেছেন নুহু মিয়া। জানতে চাইলে আকলিমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া কোনও ফাইল দেখেন না। আগেই বলেন টাকা নিয়ে আসছেন কত? গত তিন দিন ধরে আমার স্বামীর ফাইল নিয়ে ঘুরছি তার কাছে। ১০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছেন। পাঁচ হাজার দিয়েছিলাম। টাকা নিয়ে গুনে পাঁচ হাজার দেখে বললেন পুরো ১০ হাজার টাকাই লাগবে। এরপর আমাকে টাকা ফেরত দেন। আমার চোখের সামনে দিয়ে যারাই এসেছেন, তাদের সবার কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন তিনি। এমন ঘুষখোর কর্মকর্তা জীবনে দেখি নাই।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত নুহু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘুষ নেওয়ার ভিডিও তো ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নাই। তবে যারা ভিডিও করেছে, তারা ভালো করেনি। আমি যে ঘুষ নিয়েছি আর যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সে ঘটনা সত্য। এ ব্যাপারে আমার কোনও মন্তব্য নাই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যা ব্যবস্থা নেওয়ার নিক, আমার কিছু বলার নাই।’
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলার আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী রোকনুজ্জামান রোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি বিভিন্ন দফতরের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ও পেনশনের ফাইল নানা অজুহাতে আটকে রেখে ঘুষ আদায় করা এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। এটি বড় ধরনের অপরাধ। এমন ঘুষখোর কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘুষের টাকা নেওয়ার ভাইরাল ভিডিওটি আমি দেখেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলবো।’