লিবিয়ায় জিম্মিদের ছাড়াতে মুক্তিপণের টাকা জমা দিতে হতো পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের মুক্তিপণের টাকা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসত এখানে। এসব টাকা একটি সোনার দোকানে জমা পড়ার পর আর সেখানে থাকত না। কয়েক ঘণ্টা, কখনো কয়েক দিনের মধ্যেই অর্থ ছড়িয়ে যেত একাধিক ব্যাংক হিসাব ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এক হিসাব থেকে আরেক হিসাবে, তারপর আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। এভাবেই চলত টাকার যাত্রা।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, এ পদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করা। তদন্তকারীদের ভাষায়, এটি ছিল মানি লন্ডারিংয়ের পরিচিত কৌশল ‘লেয়ারিং’।
ব্যাংকের পর ব্যাংক : অনুসন্ধানে ৩৪ ব্যক্তি ও ১৮ প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব হিসাবে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ ৫৪ হাজার ৯৬৬ টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। সিআইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো একটি হিসাব থেকে বড় অঙ্কের টাকা অন্য একটি হিসাবে পাঠানো হয়েছে। এরপর সেই অর্থ আবার কয়েকটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ভাগ হয়ে গেছে। এতে অর্থের মূল উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ড. জসীম উদ্দিন খান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত ব্যবসার ধরন এবং লেনদেনের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়।’
যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম এসেছে : সিআইডির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে মিতু গার্মেন্টস, জে কে এন্টারপ্রাইজ, কাজী জুয়েলার্স, দাউদকান্দি ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কম্পিউটার, জান্নাত মিডিয়া সেন্টার, রিফাত ট্রেডার্স, ভাই ভাই ট্রেডার্স, হাবিবা এন্টারপ্রাইজ, অরণা এন্টারপ্রাইজ, তনুর মেডিকেল হল, রুবেল ট্রেডার্স, ফরাজী এন্টারপ্রাইজ, হামিদ শামীম অ্যান্ড এগ্রো এইড ফার্মসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সিআইডি বলছে, এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ বাস্তব ব্যবসার পাশাপাশি অথবা ব্যবসার আড়ালে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ব্যক্তিগত হিসাবও ছিল নেটওয়ার্কের অংশ : তদন্তে এমন কয়েকজন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাদের হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অনুসন্ধানকারীদের দাবি, তাদের কেউ কেউ কমিশনের বিনিময়ে নিজেদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে দিতেন। প্রতি লাখ টাকায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশনের বিনিময়ে এসব হিসাব ব্যবহার করা হতো। সিআইডির মতে এ পদ্ধতিতে অর্থ কয়েক ধাপে স্থানান্তরিত হওয়ায় প্রকৃত সুবিধাভোগীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। সিআইডির দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেন সংস্থাটির এসআই মিজানুর রহমান।
সোনার দোকান কেন : তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সোনার ব্যবসায় নগদ লেনদেন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা অপরাধী চক্রের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, তাঁতীবাজারের সংশ্লিষ্ট দোকানটিতে মুক্তিপণের টাকা গ্রহণের পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রা কেনাবেচার আড়ালেও হুন্ডির কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
যেসব ব্যাংকের হিসাব খতিয়ে দেখা হয়েছে : অনুসন্ধানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে একাধিক ব্যাংকের হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা রয়েছে। তদন্তকারীদের মতে এত বিস্তৃত ব্যাংক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করায় লেনদেনের সামগ্রিক চিত্র বুঝতে সময় লেগেছে। আর্থিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস, বিদেশভ্রমণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পারস্পরিক যোগাযোগও যাচাই করা হয়েছে।