গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে পুলিশের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্যদের প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগ একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীন পুলিশ তদন্ত করলে বিচার কতটা নিরপেক্ষ হবে। তাদের মতে, নতুন খসড়ায় তদন্ত ও বিচার কাঠামোয় আনা পরিবর্তন গুমের বিচার নিশ্চিত করার বদলে প্রক্রিয়াটিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইন ও নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য।
কমিশনের হিসাবে, এ পর্যন্ত গুম-সংক্রান্ত ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সম্ভাব্য গুম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫১ জনের আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। গুমের পর ৩৬ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। কমিশনের ধারণা, প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
এই বাস্তবতায় বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠন করে। পরে জারি করা হয় ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অধ্যাদেশটি সংসদে পাস না হওয়ায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
গুমকে পৃথক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগকে মানবাধিকারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও প্রশ্ন উঠেছে—নতুন আইন কি অধ্যাদেশের তুলনায় ভুক্তভোগীদের জন্য আরও কার্যকর সুরক্ষা দেবে, নাকি তদন্ত ও বিচারের পথ আরও কঠিন করবে?
তদন্ত কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন
সংশ্লিষ্টদের মতে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তদন্ত কাঠামোয়। অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ গ্রহণ, অনুসন্ধান ও তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কমিশন নিজস্ব তদন্তকারী দল দিয়ে অনুসন্ধান চালাতে পারতো। যে বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীর সদস্যকে তদন্তে রাখার সুযোগও সীমিত ছিল।
কিন্তু নতুন খসড়া আইনে তদন্তের দায়িত্ব মূলত পুলিশের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। এখানেই আপত্তি তুলছেন মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্যরা। তাদের যুক্তি, গুমের অভিযোগের বড় অংশই যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে হয়, তাহলে একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে পুলিশ দিয়ে তদন্ত করালে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশে বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলাদা করা হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে। আর বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে গঠিত তদন্ত দল।
তিনি বলেন, "বর্তমান সরকার যে আইন প্রস্তাব আকারে হাজির করেছে, সেখানে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। ধারাবাহিক গুমের ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আইসিটির অধীনে তদন্ত ও বিচার হবে—এটি রাখা হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। আর সেগুলোর বিচার হবে সাধারণ আদালতে।"
'পুলিশ গুমের অভিযোগ যথাযথ তদন্ত করেছে, এমন নজির নেই'
নূর খান লিটনের মতে, গুমের অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পুলিশ কখনও যথাযথভাবে তদন্ত করেছে—বাংলাদেশে এমন নজির নেই। বরং বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ নেওয়া হয়নি, অভিযোগকে ব্যক্তিগত শত্রুতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অথবা ‘গুম’ শব্দ এড়িয়ে 'নিখোঁজ' হিসেবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, গুমের অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পুলিশ কখনও যথাযথভাবে তদন্ত করেছে—এমন নজির নেই। বরং এসব ঘটনা অন্য খাতে প্রবাহিত করার নানা চেষ্টা দেখা গেছে।’
তার মতে, গুমের তদন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতো। বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের পথও খুলত।
নূর খান লিটন বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে দরকার সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার এই জায়গাটি যদি দুর্বল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধ করা বা অতীতের গুমের বিচার নিশ্চিত করা—কোনোটিই সম্ভব হবে না।’
কমিশন বাদ, সামনে পুলিশি তদন্ত কাঠামো
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য সাজ্জাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন, ২০২৬-এ কমিশনকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্দেশনা অমান্যের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধানও রাখা হয়নি। তার মতে, এর ফলে গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য কার্যকর কোনও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকছে না।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সব অভিযোগ গ্রহণ করতে পারত এবং নিজস্ব তদন্তকারী নিয়োগ করতে পারত, যারা পুলিশি কমান্ড কাঠামোর বাইরে থেকে কাজ করতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আইনে সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে কোনও কার্যকর স্বাধীন বিকল্পও রাখা হয়নি।
সাজ্জাদ হোসেনের মতে, নতুন খসড়ায় পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করবে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্ত পরিচালনা করবে এবং মামলা দায়রা জজ আদালতে পাঠাবে। অর্থাৎ, যেসব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার হওয়ার কথা, সেই একই আইনশৃঙ্খলা কাঠামো অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও মামলা পরিচালনার প্রতিটি ধাপের দায়িত্বে থাকবে।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল না সাধারণ আদালত
বিচার কাঠামোতেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের মামলা বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান ছিল। সরকার বিভাগ বা জেলা পর্যায়ে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারত। অভিযোগ গঠনের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার ধারণাও ছিল।
কিন্তু নতুন খসড়ায় বিচ্ছিন্ন গুমের অভিযোগ সাধারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নিষ্পত্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারের যুক্তি, একাধিক বিচারব্যবস্থা তৈরি না করে প্রচলিত ব্যবস্থাতেই অপরাধটির বিচার করা।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল না থাকলে গুমের মতো জটিল অপরাধ সাধারণ মামলার ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।
কমান্ড দায় ও গোপন আটককেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন
প্রস্তাবিত আইনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা বা কমান্ড রেসপনসিবিলিটি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনও শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি জানতেন অথবা জানার যৌক্তিক কারণ থাকত যে তার অধীনস্থ কেউ গুম সংঘটিত করতে যাচ্ছে, তারপরও তিনি তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে দায়ী হতে পারতেন।
গুম কমিশনের সাবেক সদস্য সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের খসড়া আইনে এই ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে। এখন দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠায় সরাসরি নির্দেশ, ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ বা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততা প্রমাণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনও কমান্ডার মৌখিক নির্দেশ দিলে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলে বা লিখিত নথি না রাখলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য গোপন আটককেন্দ্র শনাক্তের ক্ষমতা নিয়ে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন নিজ উদ্যোগে যেকোনও স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারত, বিশেষ করে গোপন আটককেন্দ্র শনাক্তের উদ্দেশ্যে, এমনকি অভিযোগ দায়েরের আগেও।
কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আইনে কোনও প্রতিষ্ঠানের কাছেই এই ক্ষমতা স্পষ্টভাবে রাখা হয়নি বলে মনে করেন সাজ্জাদ হোসেন। তার প্রশ্ন, ‘তাহলে গোপন আটকস্থল খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার?’
বিচার, নাকি দায়মুক্তি
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে ভুক্তভোগীর চিকিৎসা, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তার জন্য তহবিল গঠনের বিধান ছিল।
নতুন খসড়ায় ক্ষতিপূরণ যদি অপরাধীর অর্থদণ্ড বা দণ্ডাদেশের সঙ্গে বেশি যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে ভুক্তভোগী পরিবার তাৎক্ষণিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কারণ, গুমের অনেক ঘটনায় অভিযুক্ত শনাক্ত নাও হতে পারে, পলাতক থাকতে পারে অথবা বিচার দীর্ঘ হতে পারে।
তবে নতুন খসড়া আইনে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গুমকে পৃথক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, ধারাবাহিক গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনার সুযোগ, গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা ঊর্ধ্বতন আদেশকে অজুহাত হিসেবে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা এবং ভুক্তভোগীদের তথ্যভান্ডার তৈরির বিষয়গুলোকে অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে তাদের মতে, তদন্ত স্বাধীন না হলে, কমিশনের ক্ষমতা দুর্বল হলে, আটক ব্যক্তি ও আটককেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন না থাকলে এবং ক্ষতিপূরণ দণ্ডাদেশনির্ভর হয়ে পড়লে আইনটি প্রতিরোধের বদলে কেবল প্রতিক্রিয়ামূলক আইনে পরিণত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গুম প্রতিরোধের আইন শুধু শাস্তির আইন হতে পারে না। এটি হতে হবে অনুসন্ধান, সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের আইন।
তাদের ভাষ্য, আইনটি যদি সেই জায়গায় দুর্বল থাকে, তাহলে অতীতের গুমের বিচার যেমন অনিশ্চিত থাকবে, তেমনি ভবিষ্যতের গুম প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতিও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
যা বলছে সরকার
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম সম্প্রতি বলেন, ‘অতীতে বহু মানুষ স্বজন হারিয়েও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বাবা, ভাই কিংবা বোনের হত্যার বিচার পেতে অনেককে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
আইন সংস্কার প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা ও গঠনমূলক মতামতকে সরকার স্বাগত জানায়। আইন ও নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য।