গ্যাস সংকট মোকাবিলায় তিনটি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে ৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির অনুমোদন প্রস্তাব পর্যায়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন। এমনকি সম্ভাবনা খুব কম থাকার পরও খননের তালিকায় রয়েছে দুটি কূপ।
আগামী ১৪ জুলাই প্রকল্প প্রস্তাবটি নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠেয় সভায় প্রশ্নের মুখে পড়তে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, ‘একটি মূল্যায়ন কাম দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন’ প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর-৫, নোয়াখালীর সুবর্ণচর-১ এবং নোয়াখালী-১ কূপ খনন করা হবে। এটির প্রস্তাবের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সেসব পিইসি সভায় তুলে ধরা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর তখনকার উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু প্রকল্পে পরামর্শক সংস্থা বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইআইএফসির মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আইআইএফসিকে দিয়ে ফিজিবিলিটি করানোর কারণ কী? জরিপের ফলাফল বাপেক্স থেকে নিয়ে আইআইএফসি কী প্রক্রিয়ায় নতুন আউটপুট দিয়ে থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।
কূপ অনুসন্ধান কাজে আইআইএফসির নিজস্ব সক্ষমতা আছে কি না, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কেননা আইআইএফসি পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে অনুসন্ধান কূপগুলোতে গ্যাস আবিষ্কারের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। এক্ষেত্রে সুবর্ণচর-১-এ সম্ভাবনা ১৬ শতাংশ এবং নোয়াখালী-১-এ ১২ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। আগের ব্যর্থ অনুসন্ধান প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এবং হালনাগাদ ভূতাত্ত্বিক তথ্য যথাযথভাবে শেভরন বাংলাদেশের মাধ্যমে করা হয়েছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হবে। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা কম থাকলেও কেন অনুসন্ধান কূপ দুটির খনন যুক্ত করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হবে পিইসি সভায়।
এ ছাড়া ভূমি হুকুমদখল খাতে সুবর্ণচর-১ ও নোয়াখালী-১ কূপের জন্য ৫ একর এবং সুন্দলপুর-৫-এর জন্য ৬ একর অর্থাৎ তিনটি কূপের জন্য ১৬ একর ভূমি হুকুমদখলে ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ৬০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ওই ব্যয় প্রাক্কলন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি বিবেচনা ও যথার্থতার ক্ষেত্রে সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী হয়েছে কি না, তাও জানতে চাওয়া হবে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পের আইটেমভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ব্যয় প্রাক্কলন তৈরি কমিটিতে বাইরের কোনো সদস্য রাখা হয়নি। এটি একপক্ষীয় ও অভ্যন্তরীণ ব্যয় প্রাক্কলন বলে প্রতীয়মান। অঙ্গভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক আইটেমে একক হিসাবে থোক ধরা হয়েছে। এসব আইটেমে সুনির্দিষ্ট একক উল্লেখ করা হয়নি। আপ্যায়ন ব্যয় হিসেবে থোক ৬৪ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এ ব্যয় অত্যধিক বলে মনে করছে কমিশন।
এদিকে রাজস্ব খাতের বিভিন্ন আইটেম যেমন— যানবাহন ভাড়া, পরিবহন ব্যয় রিগ, রিগ সরঞ্জামসহ, অস্থায়ী শ্রমিক মজুরি, প্রচার ও বিজ্ঞাপন বাবদ প্রাক্কলিত ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমানো প্রয়োজন। প্রকল্পের পণ্য ক্রয় পরিকল্পনায় মোট ৬৮টি প্যাকেজে ২১০ কোটি ৬৮ লাখ টাকার পণ্য কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পিডি (প্রকল্প পরিচালক) পর্যায়ে অনুমোদনযোগ্য বিপুল এই প্যাকেজ কেন? তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হবে পিইসি সভায়। এ ছাড়া একই প্রকৃতির পণ্য প্রতিটি কূপের জন্য পৃথক প্যাকেজে বিভাজন করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে ক্রয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে (পেট্রোবাংলা বা মন্ত্রণালয়) এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া এটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫-এর বিধি ২৫(৬)-এর লঙ্ঘন বলা হয়েছে।