তবে তার আগে একটা ছোট্ট কথা বলে যাই।
বাংলাদেশের রাজনীতি একটা ভয়ংকর পথে হাঁটছে। জামাত এবং এনসিপিকে কোনঠাসা করতে গিয়ে বিএনপি জুলাইকে কোনঠাসা করে ফেলেছে। তারা শুধু নিজেরা এই কাজ করেনি, যে বা যারা জুলাইকে হেয় করতে চায়, বিএনপি তাদেরকেও প্রশ্রয় দিয়েছে।
ফলশ্রুতিতে জুলাই এখন একটি বিতর্কিত শব্দ।
অস্বীকার করে লাভ নেই, এই জুলাই শব্দের আবেদন এবং গুরুত্ব এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
শেখ হাসিনার পুরো শাসনআমলে বেশ কয়েকটি বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। যেগুলোর অন্তত একটি অন্য সরকারের আমলে ঘটলে, সরকার চলে যেতে বাধ্য হতো। বা সরকার পতন হতো। শেখ হাসিনা অত্যন্ত সাফল্যের সাথে প্রত্যেকটি সংকট সামলে উঠেছেন। এবং আরও শক্তিশালী হয়েছেন। শুধু জুলাইয়ে এসে তিনি আর পারলেন না।
অন্য সব ঘটনার মতো, এই জুলাইও যদি শেখ হাসিনা পার করে দিতে পারতেন, তাহলে কী হতো?
অজস্র ঘটনা ঘটতে পারতো। আমি চেরি পিকিং স্টাইলে দুটি উদাহরণ দিই।
খালেদা জিয়া তখন কার্যত গৃহবন্দী ছিলেন। শেখ হাসিনা এটিকে নিজের দয়া হিসেবে প্রচার করতে ভালোবাসতেন। বললেন, তাঁর ( খালেদার) জেলে থাকার কথা, আমি দয়া করে বাসায় রেখেছি। ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য না হলে, তিনি আবার বেগম জিয়াকে জেলে পাঠাতেন। খুব সম্ভবত কোনো ডিভিশন ছাড়াই।
এবং বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলের যতখানি অবশিষ্ট ছিলো, শেখ হাসিনা ততটুকুকেই নিঃশেষ করতেন। এবং আপনারা লিখে রাখেন, বিএনপির অনেক নেতা আত্মসমর্পন করে আওয়ামীলীগে যোগ দিতেন।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান সফল হবার কারণে অনেক কিছু ঘটেছে। এখান থেকেও চেরি পিকিং করে দুটি তিনটি উদাহরণ দিই।
বেগম জিয়া সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য যেতে পেরেছেন।
তাঁর মৃত্যু হয়েছে পরিবারবেষ্টিত অবস্থায়। তাঁর জানাজায় লাখো মানুষ নির্বিঘ্নে আসতে পেরেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। শান্তিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে।
এ সকল কিছুর জন্য ১৭ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই বিশেষ জুলাই ১৭ বছর পর এসেছে। এবং এই রকম অজস্র ঘটনার জন্ম দিয়েছে।
সংসদে যখন জামাত এনসিপিকে কটাক্ষ করতে গিয়ে জুলাই নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন ট্রেজারি বেঞ্চে বসে বিএনপির এমপিরা উল্লাস করেন। দেখতে কেমন যেন লাগে। বিশেষ করে, জয়নাল আবেদিন ফারুককে দেখে।
তিনি সেই ব্যক্তি যিনি সংসদের সামনে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশকে বলেছিলেন, থ ফালাইয়া।
অত্যন্ত সাহসী এবং তাৎপর্যপূর্ণ আচরণ। কিন্তু সেই সাহস বেশিক্ষণ টিকলো না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে খালি গায়ে দৌঁড়াতে দেখা গেলো। পুলিশ তাকে পিটিয়ে শুয়ে ফেললো।
জয়নাল আবেদিন বুঝতেও পারলেন না, এই সাহস দেখাতে গিয়ে তিনি পুলিশকে অপ্রত্যাশিত ক্ষমতা দিয়ে বসলেন। এবং এই পুলিশ বিনাদ্বিধায় এরপর কেবল পিটিয়েই গেছে। ওই জয়নাল আবেদিনের দল বিএনপিকেই।
এটার নাম রাজনীতি। বা রাজনীতির সংস্কৃতি। এজন্য আপনি বাটারফ্লাই এফেক্ট সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করতে পারেন।
ইদানীং জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা ফিরে আসবেন। রয়টার্সের মতো বার্তা সংস্থা খুবই দূর্বল এবং প্রায় অগ্রহণযোগ্য একটা সূত্র থেকে এই খবর দিকে দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
শেখ হাসিনা সত্যিই ফিরে আসবেন কিনা, জানি না। যদি আসেন, তাহলে কী হবে?
বিএনপি হয়তো ভাবছেন, শেখ হাসিনা এলে মন্দ হয় না। জামাত এনসিপিকে ঝেটিয়ে বিদায় করবে। কেননা আওয়ামীলীগের টক শো জীবিরা সারাদিন মিডিয়ায় জামাত এনসিপিকে গালি দেয়। কিন্তু বিএনপিকে কিছু বলে না। নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা এসে একই কাজ করবেন।
এখানেই বিএনপির রাজনৈতিক অজ্ঞতা।
পানি বানাতে দুইটা হাইড্রোজেন আর একটা অক্সিজেন লাগে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য দুই হাইড্রোজেন আছে। ওই একটা অক্সিজেন হলো জামাত। জামাত, পাকিস্তান, রাজাকার ছাড়া আওয়ামী লীগ তার রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। কাজেই জামাতের বিনাশ আওয়ামীলীগ করবে না।
আর এনসিপি এমনিতেই ভীষণ দূর্বল এবং ধোয়াশার ভরপুর। জুলাইয়ের একটা অংশ থেকে এনসিপি এসেছে কিন্তু এনসিপি মানে জুলাই না।
জুলাই মানে হঠাৎ ফুঁসে ওঠা শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, তরুণ এবং শিক্ষার্থী। এরা কোনো দলে নেই।
আওয়ামীলীগ এসে এমনকি বিএনপির পিছনেও লাগবে না। ১৭ বছর ধরে এই বিএনপিকে আওয়ামীলীগ দিব্যি ম্যানেজ করে এসেছে। একটা বালুর ট্রাকই যথেষ্ট।
আওয়ামীলীগের একমাত্র টার্গেট হবে তারেক রহমান।
কাউকে যখন টার্গেট করা হয়, তখন তাকে বলা হয়, সে পাকপন্থী, জংঘি। অথবা বলা হয়, সে দুর্নীতিবাজ।
তারেক রহমান বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তি যাকে একই সাথে দুইটি ট্যাগ দেয়া হয়েছিলো। তিনিই ''মিঃ টেন পার্সেন্ট আবার তিনিই তাকে সর্বহারাকে দমন করার নামে বাংলা এবং ইংরেজি ভাইদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন''। এই ন্যারেটিভ বছরের পর বছর চালানো হয়েছে। এবং দেশেষ মানুষের মাথায় ঢুকানো হয়েছে। সকল মিডিয়া এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল মাধ্যম এজন্য কাজে লাগানো হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারেক রহমান কেন টার্গেট?
ওয়েল। বাংলাদেশের যেকোনো গলিতে হাঁটেন। বাজারে যান। সেলুনে চুল কাটেন। একটা অসাধারণ জিনিস আবিষ্কার করবেন। এই দেশ পাকিপন্থী না, এই দেশ ভারতপন্থীও না। এই দেশের মানুষ মহা আনন্দে এক হয়ে বিশ্বকাপ দেখে। রাত জেগে ক্রিকেট দেখেন। আবার জুমার সময় মসজিদ ভরিয়ে ফেলে। ট্রেনে ঝুলে ঝুলে বিশ্ব ইজতেমায় যায়। এই দেশের সেলুনে হিন্দি গান বাজে। আবার আজানের সময় সিডি বন্ধ করে দেয়া হয়।
বাংলাদেশ বরাবর মধ্যপন্থী। এই মধ্যপন্থার একটা বড় প্রতীকী নেতা হচ্ছেন- তারেক রহমান।
আওয়ামীপন্থী রাজনীতি চালাতে গেলে বাজারের সবচেয়ে বড় বাঁধার নাম জামাত নয়, এনসিপি নয়, এমনকি বিএনপিও নয়। বাঁধা মি. রহমান।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যেন জুলাইয়ের পেছনে তাকাই। জুলাইয়ের সামনে তাকাই। এবং পুরো ব্যাপারটা উপলব্ধি করি। যে বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনায় বিএনপি ভুগছে, সেটা যেন তারা কাটিয়ে ওঠে। এই প্রার্থনা।