দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সরকারি খরচ নিয়ন্ত্রণে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বিএনপি সরকার। জনগণের টাকার অপচয় রোধ করতে গাড়ি ও বিমান কেনা, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ, জমি কেনা এবং নতুন আবাসিক ভবন তৈরির মতো একগুচ্ছ সরকারি খরচের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মূলত সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমানো, অপচয় বন্ধ করা এবং সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার অর্থ বিভাগ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে এই খরচ কমানোর নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে বলা হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে খরচ কমানোর এই সিদ্ধান্ত খুবই জরুরি ছিল।
টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, ‘সরকারের মিতব্যয়ী হওয়াটা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। রাজস্ব আদায়ের যে অবস্থা, তাতে এই খরচ কমানো ছাড়া উপায় ছিল না। অন্যথায় সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতো, যা দেশের অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াত।’
নতুন নির্দেশনায় বাজেটের সব ধরনের থোক বরাদ্দের খরচ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তিন লাখ কোটি টাকার মধ্যে থাকা থোক বরাদ্দসহ প্রায় এক লাখ সতেরো হাজার কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাধারণত বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের নাম না রেখে জরুরি প্রয়োজনে খরচের জন্য এই থোক বরাদ্দ আলাদা রাখা হয়। তবে খরচের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমে যাওয়ার কারণে এই থোক বরাদ্দ ব্যবস্থার প্রায়ই সমালোচনা হয়ে থাকে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, সব ধরনের গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং স্পিডবোট বা জলযান কেনা বন্ধ থাকবে। তবে যেসব সরকারি গাড়ির মেয়াদ বা আয়ু একদম শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো বদলানো, সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা এবং নতুন তৈরি হওয়া সরকারি অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় গাড়ি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কেনা যাবে। এর পাশাপাশি উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার ও ড্রোনসহ সব ধরনের আকাশযান কেনাও স্থগিত করা হয়েছে।
সরকারি আবাসিক ভবন তৈরির খরচেও রাশ টানা হয়েছে। খুব জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ছাড়া নতুন কোনো সরকারি ভবন তৈরি আপাতত বন্ধ থাকবে। একই নিয়ম থাকবে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও। উন্নয়ন বাজেটের টাকায় গাড়ি কেনা বন্ধ থাকবে, তবে প্রকল্প চালানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি গাড়ি এবং পুরোনো গাড়ি বদলানোর ক্ষেত্রে অনুমতি মিলবে।
এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নতুন করে জমি কেনাও বন্ধ করা হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি অত্যন্ত জরুরি হলে এবং পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন থাকলে জমি কেনা যাবে।
সরকারি টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে অর্থ বিভাগ। সরকারি টাকায় কোনো বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা বা শিক্ষাসফরে কর্মকর্তারা যেতে পারবেন না। এমনকি অন্য কোনো দেশ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সরকারি খরচের যেসব প্রশিক্ষণ ছিল, সেগুলোও বন্ধ থাকবে।
তবে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীদের নিজস্ব অনুদান বা সম্পূর্ণ সহায়তায় যদি কোনো বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ থাকে, তা আগের মতোই চালু থাকবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে সামরিক ও বেসামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এবারের বাজেটে বিদেশ ভ্রমণের জন্য দুই হাজার একশত আশি কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
আমদানিকৃত মালামাল যাচাইয়ের জন্য যেসব প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) এবং ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট (এফএটি) বিদেশে গিয়ে করা বাধ্যতামূলক এবং কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়, সেগুলোর জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নামী সংস্থা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ থেকে সব সরকারি সংস্থাকে বাজেটের টাকা খরচের সময় শতভাগ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার হয়।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, সীমিত সম্পদ এবং খরচের বাড়তি চাহিদার মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ শওকত উল্লাহ বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের টাকা বাঁচানো সম্ভব হবে, যা দেশের মানুষের জন্য একটি ভালো বার্তা। তবে এই উদ্যোগের ফলে ঠিক কত টাকা বাঁচবে, সে বিষয়ে তিনি এখনই সুনির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক জানাতে পারেননি।
টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘আমরা আরও বৈঠক করব। এরপরই সাশ্রয় হওয়া টাকার পরিমাণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া সম্ভব হবে।’ তবে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে তিনি আভাস দেন।
অর্থ বিভাগের উপসচিব মো. জাকির হোসেনের সই করা এই নির্দেশিকাটি অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য দেশের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগসহ সকল সরকারি অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।