Image description

উদ্বোধনের তিন বছর পরও পুরোপুরি চালু হয়নি চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা জুলাই আন্দোলনে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়ক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া চট্টগ্রামের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম এই উড়ালসড়ক। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটারের এই উড়ালসড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। শুরুতেই যানবাহন ওঠানামার জন্য ১৫টি র‌্যাম্প নির্মাণ করার কথা থাকলেও পরবর্তীতে অপ্রয়োজনীয় র‌্যাম্প বাদ দিয়ে নয়টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে চারটি নির্মিত হলেও যানবাহনের জন্য চালু হয়নি। ফলে উড়ালসড়ক চালু হলেও এর পরিপূর্ণ সুফল পাচ্ছে না মানুষ। কারণ ওঠানামার র‌্যাম্পগুলো এখনও তৈরি হয়নি। 

নগরের লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সাড়ে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়ালসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছিল ২০১৭ সালের আগস্টে। ওই সময় তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নকশাসহ নানা জটিলতায় কয়েক দফা সময় বেড়েছে। ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ঋণ দিয়েছে ৫২৪ কোটি টাকা। এই ঋণ ২০ বছরে শোধ করতে হবে। ২ শতাংশ হারে ঋণের সুদ দিতে হবে ১৩০ কোটি টাকা। পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডের পর ২০২৮ সাল থেকে সুদে-আসলে সিডিএকে ঋণ শোধ করতে হবে ৬৫৪ কোটি টাকা। 

 

২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর কাজ শেষ না করেই তড়িঘড়ি করেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এর মূল অবকাঠামোর কাজ শুরু না হওয়ায় তখনও গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে পরীক্ষামূলক গাড়ি চলাচল শুরু হয়। তবে ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি টোল আদায়ের মাধ্যমে ‘এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ থেকে নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়কে’ আনুষ্ঠানিকভাবে গাড়ি চলাচল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। পাশাপাশি বাকি কাজ শেষ করতে চলতি বছর নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়। এতে ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, নগরের ইপিজেড, সলগোলা ক্রসিং, বন্দরটিলা, আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, দেওয়ানহাট, বারেক বিল্ডিং মোড়সহ বেশ কয়েকটি স্থানে প্রতিদিন ব্যাপক যানজট লেগেই থাকে। ভিন্ন চিত্র দেখা যায় সড়কের ওপর নির্মিত দীর্ঘতম উড়ালসড়কে। বলা যায় উড়ালসড়ক অনেকটাই যানবাহন শূন্য থাকে।

 

তবে চালকরা জানিয়েছেন, উড়ালসড়কের র‌্যাম্পগুলো চালু হলে সড়কের ওপর গাড়ির চাপ কিছুটা হলেও কমতো। তখন নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে র‌্যাম্পের মাধ্যমে মূল এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করা যেতো। এখন সে সুযোগ নেই। বর্তমানে শুধু নগরের পতেঙ্গা এবং লালখান বাজার ও মুরাদপুর থেকে উঠার সুযোগ আছে।

বলা যায় উড়ালসড়ক অনেকটাই যানবাহন শূন্য থাকেবলা যায় উড়ালসড়ক অনেকটাই যানবাহন শূন্য থাকে

গত বছরের ৩ জানুয়ারি নগরের পতেঙ্গায় উড়ালসড়কের টোল আদায় কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়ক দিয়ে মোটরসাইকেল ও ট্রেইলার ছাড়া মোট ১০ ধরনের গাড়ি চলাচল করতে পারবে। এর মধ্যে প্রাইভেট কার ৮০ টাকা, মাইক্রোবাস ১০০ টাকা, পিকআপ ১৫০, মিনিবাস ২০০, বাস ২৮০, চার চাকার ট্রাক ২০০, ছয় চাকার ট্রাক ৩০০ টাকা এবং কাভার্ডভ্যান থেকে ৪৫০ টাকা হারে টোল আদায় করা হচ্ছে। তবে এটি চালু হওয়ার পর থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী যানবাহন চলাচল করছে না। কারণ মূল সড়ক এখনও চালু হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার আপত্তির কারণে এতদিন কয়েকটি র‌্যাম্প নির্মাণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বর্তমানে সে জটিলতা কেটেছে। উড়ালসড়কে বিভিন্ন স্থানে নয়টি র‌্যাম্প করা হচ্ছে। এর মধ্যে পাঁচটি র‌্যাম্প হবে ওঠার এবং চারটি র‌্যাম্প হবে নামার। ইতিমধ্যে পাঁচটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এগুলো হলো- নগরের নিমতলা মোড়ে ওঠানামার দুটি র‌্যাম্প, টাইগারপাসে আমবাগানমুখী নামার একটি এবং ফকিরহাটে নামার একটি র‌্যাম্প। এগুলো দিয়ে এখনও যানবাহন চলাচল শুরু হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আগামী নভেম্বরের মধ্যে উড়ালসড়কের পুরোপুরি কাজ শেষ করতে পারবো বলে আমি আশা করছি। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে। যেসব র‌্যাম্পের কাজ শেষ হয়েছে সেখানে টোল আদায়ের জন্য বুথ নির্মাণ করা হবে। বুথের কাজ শেষ হলে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’

এই উড়ালসড়কের কাজ শুরুর আগে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশনের করা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লালখানবাজার থেকে পতেঙ্গা সড়কে প্রতিদিন প্রায় ৮১ হাজার ২৭১টি গাড়ি চলাচল করার কথা ছিল। সে অনুযায়ী অর্ধেক যানবাহনও এক্সপ্রেসওয়েটি ব্যবহার করলে তা হওয়ার কথা ছিল ৪০ হাজারের বেশি। 

সিডিএ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করছে এই সড়কে যানবাহন চলাচল করে দৈনিক সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার। এত টোল আদায় হচ্ছে দৈনিক ৫ লাখ টাকা। তবে নগরের যানজট নিরসনের যে উদ্দেশ্যে উড়ালসড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তাতে কোনও প্রভাব পড়ছে না।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরুতেই নানা জটিলতার কারণে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ থমকে ছিল। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা উড়ালসড়কের র‌্যাম্প নির্মাণে আপত্তি তুলেছিল। আমি দায়িত্বে আসার পর বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বসে এসব জটিলতা সমাধান করেছি। আশা করছি চলতি বছরের মধ্যে সবগুলো র‌্যাম্প নির্মাণ শেষ করতে পারবো।’