মস্ত বড় কাঠের বাক্স। গায়ে সাঁটানো একটি কাগজ—মৃত্যুসনদ। যাতে লেখা, ‘স্বাভাবিক মৃত্যু। কাঁপা কাঁপা হাতে স্বজনেরা কফিনের ডালাটা সরাতেই ঘরজুড়ে আছড়ে পড়ে কান্নার রোল। পাঁচ বছর পর সৌদি আরব থেকে লাশ হয়ে ফিরেছেন হবিগঞ্জের মারুফ সরকার। দাফনের আগে পরিবারের সদস্যরা তার শরীরে দেখতে পেলেন আঘাতের কালচে চিহ্ন। কাগজে যা ‘স্বাভাবিক’, মারুফের নিথর দেহ জুড়ে তা যেনো অস্বাভাবিকতার এক নির্মম দলিল।
মারুফ সরকার একা নন, একইভাবে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো হাজারো বাংলাদেশির স্বপ্নের শেষ গন্তব্য হয়ে উঠছে একেকটি কফিন। যার সঙ্গে দেশে আসে একটি মৃত্যুসনদও। তাতে কখনো লেখা থাকে ‘হার্ট ফেইলিউর’, আবার কখনো ‘স্ট্রোক’ কিংবা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’। কিন্তু কফিন খুলে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় দেখতে পান শরীরে আঘাতের চিহ্ন, নির্যাতনের আলামত কিংবা এমন সব অসঙ্গতি, যার মেলে না কোনো ব্যাখ্যা।
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রবাসী কর্মীদের প্রায় ২৭ শতাংশ মৃত্যু অস্বাভাবিক। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত মৃত্যুর কারণ আড়াল করতেই অনেক ক্ষেত্রে এমন মৃত্যুসনদ দেওয়া হয়। মরদেহ দেশে ফিরলেও হয় না ময়নাতদন্ত। ফলে রহস্যের কোনো কূলাকিনাড়া না হয়েই হয়ে যায় দাফন। যেমনটি দাফন হয়ে গেছে হবিগঞ্জের মারুফের দেহ, কিন্তু দাফন হয়নি তার স্বজনদের মনে জমে থাকা বহু প্রশ্নের। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ২০১৪ সালে সৌদি আরবে যান মারুফ সরকার। ২০১৯ সালে তার মৃত্যুর এক মাস পর মরদেহ আসে দেশে। সঙ্গে থাকা সনদে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ থাকলেও শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন। মারুফের বোন সালমা আক্তার ডুকরে কেঁদে আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যারা বিদেশে পাঠিয়েছিল তারা বিষয়টি নিয়ে ঝামেলা না করতে বলে। পরে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই দাফন করা হয়।’ যদিও মরদেহের ময়নাতদন্ত করে এই রহস্যের শেষ দেখতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু দালালদের চাপে বন্ধ হয়ে যায় সেই পথও।
দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে হবিগঞ্জেরই ২০ বছর বয়সী ববিতা ২০২২ সালে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। এক বছরের মাথায় তার মরদেহ দেশে ফিরে। পরিবারের হাতে দেওয়া মৃত্যুসনদে উল্লেখ ছিল, স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন ববিতা। অথচ ওই সনদে তার বয়স লেখা হয়েছিল ২৮ বছর। ববিতার বাবা বললেন, ‘আমার মেয়ের প্রকৃত বয়স আরও কম ছিল। তার কোনো গুরুতর রোগও ছিল না।’
একই ধরনের অভিযোগ ঝিনাইদহের শাকিলা খাতুনের পরিবারেরও। সৌদি আরবে থাকাকালে শাকিলা নিয়মিত ফোন করে তার ওপর চলা নির্যাতনের কথা জানাতেন বলে পরিবারের দাবি। কিন্তু মৃত্যুর পর শাকিলার মরদেহের সঙ্গে পাঠানো সনদে লেখা হয় ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’। মরদেহ দেশে আসার পরও এ ঘটনায় কোনো তদন্ত হয়নি বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে প্রকাশ করে ‘বাংলাদেশি নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অকাল মৃত্যু’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন। যাতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়, গত ৩০ বছরে বিদেশে ৪৬ হাজার ৫০৩ জন বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তবে গন্তব্য দেশেই দাফন হওয়া ব্যক্তিদের হিসাব এতে নেই, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
গবেষণার তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে ফিরেছে ১৯ হাজার ৪৯৫টি মরদেহ। এর মধ্যে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। যদিও মোট অভিবাসী শ্রমশক্তির প্রায় ১২ শতাংশ নারী, তবুও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মৃত নারী অভিবাসীদের গড় বয়স মাত্র ৩৭ বছর, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোতে এ গড় বয়স ৪৬ বছর।
মৃত্যুসনদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘প্রাকৃতিক মৃত্যু’ এবং ২২ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘স্ট্রোক’ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ আত্মহত্যা, ১৪ দশমিক ২ শতাংশ দুর্ঘটনা এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ হত্যাকাণ্ড হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পরও অনেক মৃত্যুর সনদে ‘হার্ট ফেইলিউর’ লেখা হয়। জানা যায়, নারী অভিবাসীদের আত্মহত্যার ৬২ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে সৌদি আরবে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে ফেরত আসা প্রবাসীদের মরদেহের তথ্য সংরক্ষণ করছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩৩ বছরে ৬২ হাজার ৬৮৮ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছরই এ সংখ্যা বাড়ছে। কয়েক বছর আগেও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি মরদেহ দেশে ফিরলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৪টিতে পৌঁছেছে।
২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো এক বছরে তিন হাজারের বেশি প্রবাসীর মরদেহ দেশে আসে। ওই বছর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭৬ জন। এরপর ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৩৩৫, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৩০৭, ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৪৮১, ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৮৭, ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৭৯৩, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৪০, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮ এবং ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪ জনের মরদেহ দেশে আসে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৫২ জনে এবং ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরে। এদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে।
রামরুর গবেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ শ্রমবাজারের দেশগুলোতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মৃত্যুহার এত বেশি কেন, তা নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনো বিস্তৃত অনুসন্ধান হয়নি। একইভাবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণও যাচাই করা হয় না। মৃত্যুসনদে যা লেখা হয়, সেটিই চূড়ান্ত হয়।
অকাল মৃত্যু ধ্বংস করে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি। বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর ২০২০ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর পর ৯৫ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ পরিবারের আয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ৮১ শতাংশ পরিবার প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে না, ৬১ শতাংশ পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং ৯০ শতাংশ পরিবার দৈনন্দিন খাবারের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত, নির্ভুল মৃত্যুসনদ, বাধ্যতামূলক ময়নাতদন্ত এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের কার্যকর ব্যবস্থা না হলে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ শব্দ দুটি বহু পরিবারের কাছে চিরকালই একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসা কোনো প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ বা সন্দেহ থাকলে প্রয়োজনে পুনরায় ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা উচিত। এর মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে এবং স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক—তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশ থেকে পাঠানো মৃত্যু সনদে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ থাকে। এ ধরনের অসঙ্গতির কারণ অনুসন্ধান করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা জরুরি। এতে পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।’