Image description

সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে দেশের আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি (৩৮.৭০ বিলিয়ন) ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি (৩৯.৩৫ বিলিয়ন) ডলার। অর্থাৎ বিদায়ী অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১.৬৪ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাকের মধ্যে ওভেন পোশাক রপ্তানি ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে সামান্য কমে ১৮.০৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৬১ শতাংশ কম। অন্যদিকে নিট পোশাক রপ্তানি ২১.১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০.৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে ২.৫৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। রপ্তানি আয় কমায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে তারা মনে করেন। এমনকি বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানও হারাতে পারে বাংলাদেশ।

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ওই বছর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের রপ্তানি ছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এরপর থেকে রপ্তানির এ চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল এসোসিয়েশনের (ভিআইটিএএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানি এরই মধ্যে ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং চলতি বছরে ৪৭ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে দেশটির। একই সময়ে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ফলে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

শুধু বৈশ্বিক রপ্তানি নয়, বাংলাদেশের প্রধান দুই বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পোশাক আমদানি পরিসংখ্যানও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯.৩৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের রপ্তানিও কমেছে। তবে ভিয়েতনামের পতন হয়েছে মাত্র ০.৭ শতাংশ। ওটিইএক্সএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১১.২৪ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১.৩১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ২.২৭ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৪.০৭ শতাংশ। অর্থাৎ বৈশ্বিক চাহিদা কমলেও প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ বাজার ধরে রাখতে বা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাতটি শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ বন্ধ হয়েছে ইসলাম গার্মেন্টস (ইউনিট-২)। এসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও রপ্তানিতেও।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হয়েছে রপ্তানি কমে যাওয়ার ধারাতে। ১২ মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেতিবাচক বা ঋণাত্মক ০.৫৮ শতাংশ। মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানিতে ২৪.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই ছিল নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির। অর্থাৎ অর্থবছরের মোট নয় মাসে রপ্তানি কমার চিত্র দেখা গেছে। জুনে ২৫.৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও রপ্তানিকারকরা বলছেন, সেটি মূলত আগের বছরের নিম্ন ভিত্তির প্রভাব।

এদিকে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি বাজারের চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ৪.৯ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ১০.৮১ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.০৩ শতাংশ। ইউরোপের অন্যতম বড় বাজার স্পেনে প্রবৃদ্ধি থাকলেও সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় বাজারে চাপ স্পষ্ট।
দেশের রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের মতে, গত অর্থবছর টিকে থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের হিসাবে পোশাক খাতে প্রকৃতপক্ষে ১০ থেকে ১২ শতাংশের মতো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপ ছিল। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পুরনো ক্রেতাদের ধরে রাখতে পারলেও নতুন ক্রয়াদেশ প্রত্যাশামতো বাড়েনি। আগামী বছর বড় ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডার নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমাদের পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। আগামী কয়েক মাসে রপ্তানি খুব বেশি বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্য সংযোজন। আমরা যদি দ্বিতীয় অবস্থানে থেকেও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে না পারি কিংবা মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারি, তাহলে সেই অবস্থানের তেমন অর্থ থাকে না। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন শুল্কনীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি, ভিয়েতনামের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধা, ভারত-ইইউ সম্ভাব্য এফটিএ, পণ্যের দরপতন এবং দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি, অর্থায়ন, লজিস্টিকস ও নীতিগত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই।