Image description
Saleh Hasan Naqib (সালেহ হাসান নকীব)

 
সাকিব আনজুমের সাথে আমার পরিচয় কয়েক ঘণ্টার। আগস্টের পাঁচ তারিখ সহস্র ছাত্র-জনতার ভিড়ে, সাকিব হাত মিলিয়েছিল। শক্তসমর্থ হাসি মুখের এক তরুণ। তখন বেলা ১১টার মত। সেই মুহূর্তে তার নামটাও আমার জানা ছিল না। হাজারো তরুণের একজন।
 
বেলা সাড়ে বারোটার দিকে আমরা যখন মিছিল নিয়ে শাহ মাখদুম কলেজের কাছে, তখন আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করা শুরু করে। সেই সাথে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ। মিছিল, প্রবল গুলির মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
হাসিনার পতনের পর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে জানতে পারি, শাহ মাখদুম কলেজের কাছে একজন শহীদের মরদেহ পড়ে আছে। আমরা আবার যাত্রা শুরু করি। কলেজের প্রায় কাছাকাছি যখন, তখন একটি ভ্যানের উপর চাটাই জড়ানো একটি মরদেহ দেখতে পাই। চাটাই খুলে দেখি, সকালে হাত মেলানো সেই ছেলেটিকে - শহীদ সাকিব আনজুম।
 
কেমন ছিল সাকিবের শেষ সময়টুকু? সেই কাহিনী শুনেছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক ছাত্রী, অ্যানির মুখে। ছোটখাট এক বাচ্চা মেয়ে। একেবারে অপরিচিত, শহীদ সাকিব আনজুমের সাথে শেষ পর্যন্ত ছিল।
সাকিব আনজুমের কাঁধের একটু নিচে গুলি লাগে। আহত অবস্থায় ছেলেটি পড়ে যায়। এরপর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তার উপর কিরিচ নিয়ে চড়াও হয়। গুরুতর আহত এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে একটি বাসার ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। সেই বাসাতেই গুলি চলাকালীন সময়ে অ্যানি আশ্রয় নিয়েছিল। সাকিবের শেষ ঘন্টাখানেক সেখানেই কেটেছে। অ্যানি ফোন করে পুলিশের সাহায্য চেয়েছে। এ্যাম্বুলেন্স চেয়ে ফোন করেছে। কোন সাহায্য আসে নি। এক পর্যায়ে অ্যানি সাকিবকে তার মায়ের সাথে কথা বলিয়ে দিতে চেয়েছে - সাকিবের উত্তর ছিল, মা অসুস্থ, আমার এই অবস্থা জানলে সহ্য করতে পারবেন না। এর থেকে সাহসী আর করুণ কিছু হয় না।
একদল জানোয়ার কীভাবে আমাদের সোনার টুকরো ছেলেদের কেড়ে নিয়েছে!
 
সাকিবের রক্তপাত কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছিল না। অচেনা অ্যানি তার মৃত্যুপথযাত্রী ভাইয়ের রক্ত পড়া বন্ধ করতে তার পরনের কাপড় ব্যবহার করে। এই মেয়েটি কিন্তু নিকাব এবং হিজাবধারী। সেই রক্তে ভেজা কাপড় মেয়েটি এখনো সেভাবেই রেখে দিয়েছে। অ্যানি সাকিবকে কালেমা পড়ায়, সচেতন রাখার চেষ্টা করে। কোথাও থেকে কোন সাহায্য আসে নি। সাকিব আনজুম, শহীদ সাকিব আনজুম হয়ে যায়। বীরত্ব, ত্যাগ আর মন ভেঙ্গে দেওয়া গল্প।
 
এই দেশটাকে নিয়ে যাদের আজকাল নিত্যনতুন মতলব মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তাদের অনেকেই জুলাই-আগস্টের আগুণ ঝরা দিনগুলোতে গর্তে অবস্থান করছিল। তাদের সতর্ক হওয়া উচিৎ। আমাদের সন্তানরা দেখিয়ে দিয়েছে তারা কী পারে।
 
আমরা ভুলি না। আমরা ভুলব না। আমরা ভুলতে দিব না।