নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির সংসদীয় আসন পুনবির্ন্যাস কমিটির সাবেক সদস্য সামসুল আলম। গত ২৩ জুলাই তাঁকে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার।
সামসুল আলমের নিয়োগ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তাঁর নিয়োগকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিএনপির ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও অসন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, এই নিয়োগ শুধু বিএনপি নয়, বহু ত্যাগের বিনিময়ে ফিরে পাওয়া দেশের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার স্ট্রিমকে বলেন, ‘এটি বিএনপির জন্য আত্মঘাতী। একইসঙ্গে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। কারণ, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের ওপর জনআস্থাই হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। কোনো নিয়োগে যদি এই আস্থা নষ্ট হয়। তা শুধু বিএনপি না, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও ক্ষতিকর। এটি দুর্ভাগ্যজনক, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।’
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলিম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এই নিয়োগ নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী হলে ঠিক আছে। যদি তা না হয়, তাহলে এটি সত্যিই দুশ্চিন্তার।’
যোগাযোগ করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না। কারণ, আমি ঠিক এই সম্পর্কে কিছুই জানি না।’ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তথ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, বললেন নিরপেক্ষ থাকব
সামসুল আলম ২০১৮ সালের মার্চে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব পদে থেকে অবসরে যান। সে সময় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তথ্য পাচারের অভিযোগে। গ্রেপ্তারের পরে সামসুল আলম ৬৩ দিন কারাগারে ছিলেন। কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে দলটির সংসদীয় আসন পুনবির্ন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন সামসুল আলম। এছাড়া তিনি বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটিরও সদস্য ছিলেন।
যোগাযোগ করলে স্ট্রিমের কাছে পদগুলোর কোনোটি অস্বীকার করেননি সামসুল আলম। তবে তিনি ইসিতে নিরপেক্ষ থাকবেন জানিয়েছেন। সামসুল আলম বলেন, ‘আমি চেয়ারে বসে গেছি। এখন আমি আর কোনো দল-মতের নই, সবার। আমি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক সংস্থায় বসছি, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব।’
২০১৮ সালে জেল খাটার বিষয় তিনি বলেন, ‘আগের বিষয়, এখন তেমন মনে থাকে না। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা সবাই জানে। আমি সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। সেই প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি একটু কষ্ট পেয়েছি। যাই হোক, এগুলো আমি ভুলে গেছি। আমি নিরপেক্ষ চেয়ারে বসছি, এখন নিরপেক্ষতা ছাড়া আমি কিছুই বুঝি না।’
নিয়োগের সঙ্গে ইসির কোনো সম্পর্ক নেই
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের না জানিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সামসুল আলমকে নিয়োগ দিয়েছে। সরকারের নির্দেশনা থাকলে তা মেনে নিতে হয়। কারও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ইসির কোনো মাথাব্যথা নেই।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সামসুল আলম ইসিতে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। উনি সোমবার যোগদান করেছেন, এটুকুই (দ্যাটস অল)। এখন উনার রাজনৈতিক পরিচয় কী ছিল বা ছিল না– এ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।’
আমি চেয়ারে বসে গেছি। এখন আমি আর কোনো দল-মতের নই, সবার। আমি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক সংস্থায় বসছি, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব।সামসুল আলম, ইসির অতিরিক্ত সচিব
২০১৮ সালে নির্বাচনের তথ্য পাচারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেটি অন্য ব্যাপার। সেটির সঙ্গে উনার বর্তমান নিয়োগ এবং কর্মস্থলের সম্পর্ক নেই। সেটি আমারও চিন্তার বিষয় না (দ্যাট ইজ নট মাই কনসার্ন)। আমার কাছে সামসুল আলম অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন, এটাই।’
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কাগজ নিয়ে আসছে। উচ্চ পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ (কম্পিটেন্ট অথরিটি) যারা, তাদের কাছ থেকে কাগজ নিয়ে আসছে। এখন একজন কাগজ নিয়ে আসলে কী করার আছে? তাঁকে তো যোগদান (জয়েন) করায়ে দিতে হয়। আমরা তো তাঁকে কোনো নিয়োগ দিই নাই। এই নিয়োগের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই।’
প্রতিবাদ জামায়াত-এনসিপির, নিয়োগ বাতিল দাবি
সামসুল আলমের নিয়োগ নিয়ে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামী। সেখানে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি অতি সংবেদনশীল ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এর মূল ভিত্তি হলো শতভাগ নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখানে সামসুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি বিএনপির একটি নির্দিষ্ট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সামসুল আলমের মতো সক্রিয় রাজনীতিককে নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব দেওয়া অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি চরম প্রতারণা। এই ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অবিলম্বে তাঁর বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ বাতিল করতে হবে।’
গত ২৬ জুলাই এই বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থার প্রধান শর্তই হলো নির্বাচন কমিশন ও এর প্রশাসনিক কাঠামোকে শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। কিন্তু এই নিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্তাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে অবিলম্বে সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের দাবি জানায় এনসিপি।