Image description

বাইরের সুন্দর রূপ দেখে এদের আসল চেহারা বোঝার কোনো উপায় নেই। ভেতরের বিপজ্জনক ও গাদাগাদি পরিবেশের এক একটি ফ্ল্যাটে ১৫ থেকে ২০ জন নারী বাসিন্দাকে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে, যেখানে নড়াচড়া করার মতো কোনো জায়গা নেই।

সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের এই ফ্ল্যাটগুলোর প্রতিটি রুমে থাকেন চার থেকে পাঁচজন নারী। এ সমস্যার ওপর আবার মাঝে মাঝেই ভূমিকম্প হচ্ছে, যা বাসিন্দাদের মনে সৃষ্টি করে তীব্র আতঙ্ক।ভূমিকম্প হলেই তারা ভয়ে এক জায়গায় জড়োসড়ো হয়ে থাকেন, কারণ ভবন থেকে নিরাপদে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

এটিই ঢাকার বেসরকারি নারী হোস্টেলগুলোর আসল চিত্র। নিরুপায় হয়ে থাকার জন্য এমন বিপজ্জনক জায়গা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেননারী শিক্ষার্থী এবং চাকরিজীবীরা।

এসব হোস্টেল তাদের শুধু রাতে ঘুমানোর জায়গা দিচ্ছে, কিন্তু নিরাপদ ও ভালো মানের আবাসন নিশ্চিত করতে পারছে না।

সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো তদারকি ছাড়াই এসব ভবনে বসবাস করছেনহাজার হাজার শিক্ষার্থী।সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছামাফিক নারী হোস্টেলের এ ব্যবসা চালাচ্ছেন ভবন মালিকরা। এখানে সরকারের কোনো নজরদারি নেই বলে বাংলাদেশ টাইমসকে জানিয়েছেন হোস্টেলের বাসিন্দারা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া বেগম টাইমসকে জানান, বেসরকারি নারী হোস্টেলগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা নিয়মকানুন নেই।এ বিষয়ে কোনো নিয়ম চালু করা দরকার কি নাতা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রীর।

 

তবে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং সচিব ইয়াসমিন পারভীনকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

উচ্চ চাহিদা ও শোচনীয় পরিস্থিতি

প্রতি বছর হাজার হাজার ছাত্রী এবং কর্মজীবী নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, কোচিং, উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য ঢাকায় আসেন।তাদের মধ্যে খুব কম মানুষেরই একটি পুরো ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার মতো টাকা থাকে। তাছাড়া অধিকাংশ বাড়ির মালিকএকা নারীদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে চান না।

যারা মাত্র ৩-৪ মাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচিং করতে আসেন, তাদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। এত কম সময়ের জন্য বাসা পাওয়া খুবই কঠিন, তাই বেসরকারি হোস্টেলগুলোই তাদের একমাত্র ভরসা।

কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব হোস্টেলের বেশির ভাগ রুমেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই। মানুষের তুলনায় বাথরুম এবং রান্নাঘরের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় প্রতিদিন নারীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়।

 

আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র রাখার জায়গা না থাকায় বাসিন্দারা একই ঘরের ভেতর কাপড় শুকাতে, নিজেদের জিনিসপত্র ও রান্নার বাসনকোসন রাখতে বাধ্য হন। ফলে প্রায়ই এসব জিনিস তাদের বিছানা এবং পড়ার টেবিলের ওপর স্তূপ হয়ে থাকে।

এমন খারাপ পরিবেশে থাকার জন্যও বাসিন্দাদের গুনতে হয় অনেক টাকা। এমন বেসরকারি হোস্টেলগুলোর মাসিক রুম ভাড়া ৭,০০০ টাকা থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত।কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই খরচ আরও বেশি, যা প্রায় সাড়ে ১০ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা।

এই চড়া মাসিক ভাড়ার ওপর আবার অনেক হোস্টেল শুরুতে এককালীন সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৮,০০০ টাকা বা তার বেশি কেটে নেয়।

মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র

ফার্মগেটের গ্রিন রোডের আরএইচ হোম সেন্টার একটি বহুতল ভবন। বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় বড় কোচিং সেন্টারের কাছে হওয়ায় এই ভবনেই ৫-৬টি নারী হোস্টেল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সাগরিকা ছাত্রী নিবাস এবং সিনট্যাক্স ভিআইপি হোস্টেল অন্যতম। এদের প্রতিটি ফ্ল্যাটে ১৫ জনেরও বেশি বাসিন্দা গাদাগাদি করে থাকেন।

পার্টিক্যাল বোর্ড বা কাঁচের দেয়াল দিয়ে রুমগুলোকে ভাগ করে এক সিট, দুই সিট, তিন সিট বা চার সিটের রুম বানানো হয়েছে।

এই অস্থায়ী রুমগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো জানালা নেই, যার ফলে আলো-বাতাস একেবারেই ঢুকতে পারে না।

অপেক্ষাকৃত বড় ৩-৪ বেডের ফ্ল্যাটের রুমগুলোতে মাত্র একটি ফ্যান এবং একটি ছোট জানালা রয়েছে, ফলে গরমের দিনে ঘরগুলো অসহনীয় রকম গরম হয়ে ওঠে।

রুমের মধ্যে জায়গা এতটাই কম যে বিছানা এবং পড়ার টেবিল রাখার পর হাঁটার জায়গা থাকে না। বাধ্য হয়ে বাসিন্দারা ঘরের ভেতরেই দড়ি টাঙিয়ে কাপড় শুকান।কিছু জায়গায় রান্নার সিঙ্কের ঠিক পাশেই বিছানা পাতা হয়েছে, আবার কোনো কোনো রুমে দেয়াল থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে বিদ্যুতের তার।

সাগরিকা হোস্টেলের প্রতিটি ফ্লোরে ৮টি করে ফ্ল্যাট আছে, যা পুরো প্রতিষ্ঠান জুড়ে মোট ৪০ থেকে ৪২টি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটে দুটি করে বাথরুম থাকলেও, এক ফ্লোরের ৮টি ফ্ল্যাটের সব বাসিন্দাকে একটি মাত্র রান্নাঘর ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়।

এই হোস্টেলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিনিধি দাবি করেন, বাসিন্দার সংখ্যা সবসময় এক থাকে না। সাধারণত প্রতি ফ্ল্যাটে ৭ থেকে ১০ জন মানুষ থাকেন।

তবে ফ্ল্যাটগুলোতে বাস্তবে ১২ জনের বেশি মানুষ থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কথা ঘুরিয়ে বলেন, এই সংখ্যা ওঠানামা করে এবং মাঝেমধ্যে কিছু সিট খালিও থাকে।

অন্যদিকে, সিনট্যাক্স ভিআইপি হোস্টেলে ২৫০ থেকে ৩০০ জন বাসিন্দা থাকেন। এর কিছু রুম এত ছোট যে একটি সিঙ্গেল বেড আর পড়ার টেবিল রাখলেই ঘরের মেঝে পুরোপুরি ভরে যায়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি সিঙ্গেল বেডের রুমে জানালা থাকলেও সেটি খোলার উপায় নেই। কারণ ঠিক তার ওপাশেই আরেকটি রুম তৈরি করা হয়েছে।

এমন অবস্থা সত্ত্বেও হোস্টেলের এক কর্মী দাবি করেন, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব ভালো। প্রমাণ হিসেবে তিনি ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রতি ফ্লোরে ৪টি করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকার কথা জানান।

ঢাকার নারী হোস্টেলগুলোতে জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়া এবং ভবন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি রয়েছে।

হাতিরপুলের মেহেরুন্নেসা মেমোরিয়াল হোস্টেলের সাবেক বাসিন্দা তানিয়া আক্তার জানান, সেখানকার পরিচ্ছন্নতা ভালো হলেও রাত ১০টার পর লিফট বন্ধ করে দেওয়া হতো। এর ফলে প্রায়ই তাকে হেঁটে ১৬ তলা পর্যন্ত উঠতে হতো। এরউপর আবার সিঁড়িরকিছু অংশের অবস্থাও ছিল খুব খারাপ।

এ বিষয়ে জানতে হোস্টেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যবিধি এবং নিরাপত্তার বিষয়টি অন্যান্য জায়গাতেও একইভাবে অবহেলা করা হচ্ছে।

আজিমপুরের নূর-এ-জান্নাত হোস্টেলের একজন বাসিন্দা জানান, সেখানকার বাথরুম এবং রান্নাঘর ১৫ দিনে মাত্র একবার পরিষ্কার করা হয়। আর শোয়ার ঘর ঝাড়ু দেওয়া হয় সপ্তাহে মাত্র একবার।

ভবনের দ্বিতীয় ও পঞ্চম তলায় অবস্থিত এই আজিমপুর হোস্টেলটির জরুরি বহির্গমন পথ বলতে রয়েছে মাত্র একটি সিঁড়ি।

আগুন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি

হাতিরপুলের মেহেরুন্নেসা মেমোরিয়াল হোস্টেলটি ভবনের ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ১৪, ১৫ এবং ১৬ তলায় অবস্থিত। এক বাসিন্দা টাইমসকে বলেন, ‘যদিও হোস্টেলে দুটি সিঁড়ি আছে, তবে তার একটি সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং অন্যটি ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। ওপরের তলাগুলোর সিঁড়িতে কোনো রেলিং নেই, যার মানে ভূমিকম্প বা আগুনের সময় দ্রুত নিচে নেমে আসার কোনো নিরাপদ উপায় নেই।’

এই ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল যখন পাশের একটি ভবনে আগুন লাগে এবং বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়। শিক্ষার্থীরা যখন ভয় পেয়ে সুপারভাইজারকে ফোন করেন, তখনো লিফট এবং মূল গেটগুলো ছিল বন্ধ।

বিপদ আরও বাড়িয়ে দেয় তাদের একটি জরুরি সিঁড়ি, যা রাতের নিরাপত্তার কথা বলে তালা মেরে রাখা হয়েছিল। ফলে আটকে পড়া বাসিন্দাদের বের হয়ে আসার কোনো পথই ছিল না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী ভবনের নিরাপত্তার জন্য তিনটি বিষয়কে জরুরি বলেছেন: ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নকশা, কার্যকর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মহড়া।

তিনি বলেন, সংকটের সময় বাসিন্দারা যাতে আতঙ্কিত না হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে বের হওয়ার পথ ব্যবহার করতে পারেন সেজন্য আগে থেকে প্রশিক্ষণ থাকা দরকার।

অধ্যাপক আনসারী সতর্ক করে বলেন, ‘সিঁড়ি যদি সরু হয়, তবে জরুরি পরিস্থিতিতে একসঙ্গে মানুষ নামার চেষ্টা করলে হুড়োহুড়ি লেগে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএ আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘ছয় তলার বেশি উঁচু ভবনের জন্য অবশ্যই অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন নিতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স বা ছাড়পত্র থাকতে হবে।’

এই নারী হোস্টেলগুলোর এমন কোনো ছাড়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অনেক নতুন ভবন নির্মাণের সময় এই অনুমোদন নেওয়া হলেও বেশ কিছু পুরোনো ভবন এখনও এই নিয়মের বাইরে রয়ে গেছে।’

ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি

রক্ত সঞ্চালন বিদ্যা (ট্রান্সফিউশন মেডিসিন) বিশেষজ্ঞ ডা. রাজিয়া সুলতানা টাইমসকে বলেন, অতিরিক্ত ভিড় এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এসব হোস্টেলের বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন, ‘এমন ছোট ও ঠাসাঠাসি জায়গায় বসবাসের ফলে ছোঁয়াচে রোগ খুব দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের সমস্যা এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা এখানে খুব সহজে একজনের থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে।’

ডা. সুলতানা আরও জানান, আলো-বাতাসের অভাব, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং যৌথভাবে বাথরুম ব্যবহারের কারণে চর্মরোগ এবং পেটের অসুখের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, এমন খারাপ পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকার কারণে বাসিন্দাদের শারীরিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক-উভয়ের ওপরই এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।