বেসরকারি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ৫০ কেজি ওজনের এক কোটি পিস পাটের বস্তা কিনছে খাদ্য অধিদপ্তর। এ কেনাকাটা নিয়ে খোদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যেই সমালোচনা চলছে। অভিযোগ উঠেছে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে এসব বস্তা কেনা হচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যয়ে বস্তা কেনার বন্দোবস্তে অধিদপ্তরের বাজারদর যাচাই কমিটিরও ভূমিকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ২৪তম সভায় খাদ্য মন্ত্রণালয় ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার এক কোটি পিস বস্তা কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে। খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে উন্মুক্ত দরপত্র ই-জিপি সিস্টেমে ৫০টি প্যাকেজের মাধ্যমে কাট সাইজ বি-টুইল বস্তা কেনা হচ্ছে। ব্যয় অনুমোদন করা হয়েছে ১২৬ কোটি ২৫ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকা। এ হিসাবে একেকটি বস্তার দাম পড়ছে প্রায় ১২৭ টাকা।
এর আগে গত বছরের নভেম্বরে ৫০ কেজি ওজনের যেসব বস্তা খাদ্য অধিদপ্তর কিনেছিল, তার প্রতিটির দাম ধরা হয় ৯৫ টাকা (পরিবহন, লাভ, ভ্যাটসহ)। সে হিসাবে এবার বস্তাপ্রতি বেশি খরচ হচ্ছে প্রায় ৩২ টাকা। এর অর্থ হলো এক কোটি পিস পাটের বস্তা কিনতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে ৩২ কোটি টাকা।
গত বছরের নভেম্বরে ৯৫ টাকায় ৫০ কেজি ওজনের বস্তা কেনার আগে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ভালো মানের পাটের দাম ছিল চার হাজার ৪০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা। একই মানের পাট এখনো একই দরে বিক্রি হচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তর এর আগে কখনোই এত দাম দিয়ে বস্তা কেনেনি, যদিও এবারে তারা পাটের দাম বেশি হওয়ার খোঁড়া যুক্তি দেখাচ্ছে।
জানা গেছে, বস্তার দাম বেশি হওয়ার পেছনে ভূমিকা রয়েছে খাদ্য অধিদপ্তরের বাজারদর যাচাই কমিটির। তারা এবারে প্রাথমিকভাবে প্রতিটি বস্তার উৎপাদন খরচ সুপারিশ করে ১৩৮.৩৬ টাকা। পরে ৩ জুন সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রায় ১২৭ টাকায় পাটের বস্তা কেনার অনুমোদন দেয়। দুই মাসের মধ্যে সব বস্তা কেনার কাজও শুরু হয়ে গেছে।
খাদ্য অধিদপ্তর ও একাধিক জুট মিলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বস্তার যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি। আর বেশি দামে বস্তা কেনার সুযোগ করে দিয়েছে খোদ অধিদপ্তরেরই বাজারদর যাচাই কমিটি। এটি করা হয়েছে সরবরাহকারীদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগসাজশের মাধ্যমে। কমিটি প্রতিটি বস্তার প্রাথমিক যে মূল্য নির্ধারণ করেছিল, সেখানে প্রতি মণ পাটের দাম ধরা হয় প্রায় চার হাজার ৯৮৮ টাকা। যেখানে এক কেজি পাটের দাম পড়ে প্রায় ১২৫ টাকা। অথচ এখন বাজারে প্রতি মণ ভালো মানের পাটের দাম চার হাজার ৪০০ টাকার বেশি নয়। মাঝারি মানের পাট চার হাজার ৩০০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে।
রাজশাহীর একটি পাটকলের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, ‘বস্তার দাম এত বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পাটের দাম এখন চার হাজার ৩০০ থেকে চার হাজার ৪০০ টাকার মধ্যে। মান একটু কম হলে দামও কম হয়, বস্তার দামও কম হওয়ার কথা।’
শুধু বাড়তি দাম দিয়েছে তাই নয়, কমিটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দর নিয়ে প্রতিটি বস্তার মূল্য নির্ধারণ করেছে। সেই দামগুলো বাজারে যাচাই না করেই বস্তার মূল্য সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ করা বস্তার দামের হিসাবে প্রতি বস্তার উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ২৮.৫০ টাকা। পাটের দাম ও উৎপাদন খরচ মিলিয়ে দাম ধরা হয়েছে ১১৯.৫২ টাকা, যা বাজারদরের চেয়ে বেশি বলেই জানা গেছে। এর সঙ্গে পরিবহন, স্টেনসিলিং, বেলিংয়ের খরচ ধরা হয়েছে আরও ৬ টাকা এবং সম্ভাব্য মুনাফা ধরা হয়েছে ৫ শতাংশ হারে। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে আয়কর ধরে আরও ৬.৫৯ টাকা যোগ করে সম্ভাব্য নিট মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
বস্তা উৎপাদনকারীরা বলছেন, কাট সাইজ বি-টুইল ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার বস্তার সরবরাহ মূল্য ১০০ থেকে ১১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। একাধিক মিলমালিক ও খোদ সরবরাহকারী হিসেবে কার্যাদেশ পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান এসব তথ্য জানিয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, দরপত্রে যারা অংশ নেন, তাদের কাছ থেকেই বস্তার দাম নেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। একই সঙ্গে যে বাজারদর যাচাই কমিটি করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এ কমিটিতে কিছু কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে, যারা আসলে এ সেক্টরের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নন। সেখানে রেলওয়ে এবং টিসিবির দুই কর্মকর্তাও ছিল, যাদের এ কাজের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অভিযোগ রয়েছে, একটি সিন্ডিকেট নামকাওয়াস্তে কমিটি করেছিল, যাতে করে তাদের কাজ নিয়ে কেউ প্রশ্ন না তুলতে পারে। এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের সূত্রগুলো বলছে ই-জিপি সিস্টেমে যে স্বয়ংক্রিয় দাম হিসাব করা হয়, সেখানে বাজারদর যাচাই কমিটির দেওয়া দাম মোট দামে বড় প্রভাব ফেলে। এ দাম এবং অন্যান্য খরচ জেনে গেলে যে কেউ-ই টেন্ডারের কাজ পাওয়ার মতো করে দরপ্রস্তাব করতে পারে, যেখানে প্রকৃত দাম আড়াল হয়ে পড়ে এবং সুবিধাভোগী হয় সিন্ডিকেট।
জানা গেছে, বস্তার দর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেই কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল এবং চূড়ান্ত করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভায় ওহি জুট ফাইবার্সসহ দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হলেও তাদের বাদ দেওয়া হয়। কারণ তাদের কাছ থেকে দর নেওয়া হয়েছিল এবং তা প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা নিয়মিত এমন কিছু ব্যবসায়ীকে কাজ পাইয়ে দিয়ে সহযোগিতা করে, যাদের সঙ্গে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। ফলে অতীতে কেউ কেউ বস্তা সরবরাহে অনিয়ম করলেও তাদের শাস্তি তো হয়ইনি, বরং তারাই বারবার কাজ পাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় খাদ্য অধিদপ্তরের এ সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রাখে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সরবরাহকারী ১৪টি প্রতিষ্ঠানের একটি মেসার্স চন্দ্রদ্বীপ কনস্ট্রাকশন। তিনটি লটের বস্তা সরবরাহের কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ বিগত সময়ে কাজ পেয়েও নির্ধারিত সময়ে বস্তা সরবরাহ না করা, পুরনো বস্তা অধিদপ্তরকে দেওয়ার মতো অনেক অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবু এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, বরং উল্টো বারবার কাজ পাচ্ছে। তাদের কাজ পাওয়ার সঙ্গে অধিদপ্তরের এক বড় কর্তার সখ্যের কথা কর্তারা সবাই জানেন। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।’
চন্দ্রদ্বীপ কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. মফিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারে পাটের দাম একটু বেশি। সে অনুযায়ী সব মিলে বস্তার খরচ ১০০ টাকার একটু বেশি পড়বে। তবে এবারে ভালো লাভ থাকবে।’ বাকি অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে সবসময়ই খাদ্য অধিদপ্তরের একটা মহল লেগে থাকে।’
জানা গেছে, দর মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ, বণ্টন ও বিপণন বিভাগের সাবেক পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম। সম্প্রতি তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে অধিদপ্তর। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ কমিটির প্রধান হিসেবে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামানকে। এ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছর প্রায় আট কোটি পিস বস্তা কেনে অধিদপ্তর। সিন্ডিকেট না চাইলে কারও এ কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই এবং নির্ধারিত কমিশন তাদের পকেটে পৌঁছে যায়।’
বেশি বস্তা কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘আমি আসলে এটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। সে কারণে দামটা বেশি না কম তা নিয়েও বলতে পারছি না।’