২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ৩২ এর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়া। তবে ম্যাচের ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে শেষ মুহূর্তের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। যোগ করা সময়ের ১০৩ মিনিটে জোসকো গাভার্দিওলের করা সমতাসূচক গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল করে দেন রেফারি। এরপর থেকেই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেফারিং নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে, ক্ষোভে ফেটে পড়েন ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরাও। গ্যালারি থেকে মাঠে বোতল ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারার ঘটনাও ঘটে।
টরন্টোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেওয়া হলেও খেলা গড়ায় ১০৩ মিনিট পর্যন্ত। ঠিক সেই সময়েই গাভার্দিওলের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্নের ইতি ঘটে।
গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি আসে প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘ পর্যালোচনার পর। মাঠের রেফারি প্রথমে মনে করেছিলেন, বলটি পর্তুগালের ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগার গায়ে লেগে ক্রোয়েশিয়ার মারিও পাসালিচের কাছে আসে। সেখান থেকে পাস পেয়ে গাভার্দিওল বল জালে পাঠান। সে ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বৈধ হওয়ার কথা ছিল।
তবে ভিএআর পর্যালোচনা এবং সূক্ষ্ম 'স্নিকো' প্রযুক্তির সাহায্যে দেখা যায়, ভেইগার গায়ে লাগার ঠিক আগে বলটি ক্রোয়েশিয়ার বদলি খেলোয়াড় ইগর মাতানোভিচের মাথায় খুব সামান্য স্পর্শ করেছিল। স্পর্শটি এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে স্নিকো প্রযুক্তি ছাড়া তা বোঝা সম্ভব ছিল না। ফুটবলের অফসাইড আইন অনুযায়ী, মাতানোভিচের স্পর্শের পর ভেইগার বল স্পর্শ করলেও সেটি 'ইচ্ছাকৃত ডিফ্লেকশন' হিসেবে গণ্য হয়নি। ফলে পাসালিচ অফসাইড অবস্থানে ছিলেন বলে বিবেচিত হয়। এই কারণেই নরওয়েজিয়ান রেফারি এসকাস ভিএআর দেখে গোলটি বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।
এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ক্রোয়েশিয়া শিবির। খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। গ্যালারি থেকে মাঠে বোতল ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে রেফারিং নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
বিতর্কিত এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় এসবিএসের বিশ্লেষক এবং ঘানার সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং বলেন, 'এই সিদ্ধান্তটি ফুটবলের নিষ্ঠুরতার এক চরম উদাহরণ, তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি একদম সঠিক ছিল।'
ম্যাচের রোমাঞ্চ নিয়ে তিনি আরও বলেন, 'এটি ছিল বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ রাউন্ডের লড়াইয়ের মতো—যেখানে একের পর এক আঘাত, ঘুসি, আপারকাট, সবই ছিল।'
ধারাভাষ্যকার টনি হাসব্যান্ড নাটকীয় মুহূর্তটি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'এটি কল্পনার চেয়েও বন্য এক মুহূর্ত! তারা এখনো আশা বাঁচিয়ে রেখেছে!'
গোল বাতিলের ঘোষণা এবং গ্যালারি থেকে মাঠে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের সময় তিনি বলেন, 'গ্যালারির সব দিক থেকে মাঠে বোতল বা বিভিন্ন জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।'
খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর অতিরিক্ত সময়ের ১৮তম মিনিটে শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।
পুরো ম্যাচটিই ছিল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ ও নাটকীয়তায় ভরপুর। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই অভিজ্ঞ ইভান পেরিসিচ নিচু শটে পর্তুগালের গোলরক্ষক ডিওগো কস্তাকে পরাস্ত করে ক্রোয়েশিয়াকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
এর কিছুক্ষণ পর ভ্লাসিচ আরও একবার বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেই গোলও বাতিল হয়। অন্যদিকে পর্তুগালের রাফা লেয়াওয়ের শক্তিশালী শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একটি গোলও অল্পের জন্য অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।
ম্যাচের ৬৮ মিনিটে ভ্লাসিচ বক্সের মধ্যে রেনাতো ভেইগাকে টেনে ধরলে ভিএআর দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। সেখান থেকে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো নিখুঁত শটে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তার তৃতীয় এবং নকআউট পর্বে প্রথম গোল।
১-১ সমতার পর ৮১ মিনিটে কোচ রবার্তো মার্তিনেস সবাইকে অবাক করে দিয়ে রোনালদোর পরিবর্তে রুবেন নেভেসকে মাঠে নামান। কিছুটা অসন্তুষ্টভাবেই মাঠ ছাড়েন রোনালদো। তবে মাঝমাঠ শক্তিশালী করার এই সিদ্ধান্ত পর্তুগালের খেলায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এরপর ৯৪ মিনিটে রাফা লেয়াওয়ের দারুণ এক ক্রস থেকে এসি মিলানের নতুন স্ট্রাইকার গঞ্জালো রামোস হেডে গোল করে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। সেই গোলই শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করে এবং পর্তুগালকে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি করে। একই সঙ্গে ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচের আন্তর্জাতিক ও বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারেরও অবসান ঘটে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার ম্যাচ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রথমার্ধে রাফা লেয়াও ও ব্রুনো ফার্নান্দেসের নৈপুণ্যে পর্তুগাল আধিপত্য বিস্তার করলেও দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। বদলি খেলোয়াড় ইগর মাতানোভিচ মাঠে নামার পর আক্রমণের ধার অনেক বেড়ে যায়। কোভাচিচের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসাও ভাগ্য সহায় না হওয়ার অন্যতম উদাহরণ হয়ে থাকে।
মার্কার রেটিং অনুযায়ী, পর্তুগালের গোলরক্ষক ডিওগো কস্তা ৮.৩ রেটিং পেয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পেয়েছেন ৭.৯, গঞ্জালো রামোস ৭.৮, রাফা লেয়াও ৭.৬ এবং রুবেন দিয়াস পেয়েছেন ৭.৪ রেটিং।
শেষ পর্যন্ত যোগ করা সময়ের সেই বিতর্কিত অফসাইডের সিদ্ধান্তই মদরিচের ক্রোয়েশিয়ার বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে ডাগআউটে বসে থাকা রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও বেঁচে থাকে।