Image description

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে স্কেল চলতি জুলাই মাসে বাস্তবায়ন করছে সরকার। এই বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে বেতন বৃদ্ধির ধরন, কত ধাপে বাস্তবায়িত হবে, কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে এবং কবে গেজেট প্রকাশ করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পে স্কেলের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক পর্যালোচনা শেষে চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি অথবা শেষ সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকার প্রথমে তিন ধাপের পরিকল্পনা বিবেচনা করেছিল। পরে কর্মচারী সংগঠনগুলোর আপত্তি এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় সেটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে যেকোনো পদ্ধতিতেই মূল বেতন বা বেসিক ধাপে ধাপে কার্যকর করা হলে বড় ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিনিধিরা।

সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাসিক বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্রাচুইটি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বেসিক বেতনকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে কার্যকর করতে গেলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৫ সালের পে স্কেল বাস্তবায়নের সময় বেশির ভাগ কাজ ম্যানুয়ালি করা হতো। তখন সার্ভিস বুক ও সংশ্লিষ্ট নথিতে হাতে বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন সবকিছু সফটওয়্যারনির্ভর।

 
যদি প্রথম ধাপে ৫০ বা ৬০ শতাংশ বেসিক দেওয়া হয় এবং পরে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করা হয়, তাহলে দুই দফায় পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে একযোগে এ পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা জটিল।’

তাঁর মতে, ধাপে ধাপে বেসিক কার্যকর করলে একই কর্মচারীর জন্য একাধিকবার পে ফিক্সেশন করতে হবে। এতে প্রশাসনিক কাজের চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি ভুলত্রুটি ও জটিলতার ঝুঁকিও বাড়বে। বিশেষ করে পদোন্নতি, টাইম স্কেল, নির্বাচন গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট এবং অবসরজনিত সুবিধা নির্ধারণে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অবসরপ্রাপ্তদের পাওনার কী হবে

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি (পিআরএল) শেষে চাকরি ছাড়তে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চাকরি শেষে একজন কর্মচারীর গ্রাচুইটি, পেনশন, ছুটির নগদায়নসহ সব আর্থিক সুবিধা এককালীন হিসাবের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বেতনকাঠামো যদি ধাপে ধাপে কার্যকর হয়, তাহলে ওই হিসাব নির্ধারণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আব্দুল মালেক বলেন, ‘ডিজিটাল বেতনব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্তদের পাওনা দুই বা তিন ভাগে পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে কেউ অবসরে যাওয়ার আগে আংশিক বেতন বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তী ধাপের সুবিধা পাবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। এতে বৈষম্য ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।’

তিনি বিকল্প হিসেবে প্রস্তাব দিয়েছেন, সরকার চাইলে পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করতে পারে। তবে প্রথম ধাপেই শতভাগ বেসিক বেতন কার্যকর করে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা উচিত। পরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা দ্বিতীয় ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এতে সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রয়োজন কমবে এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও তাঁদের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে কোনো জটিলতায় পড়বেন না।

সরকারের অবস্থান কী?

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জানান, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকার নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইশতেহারে বলা হয়েছিল যথাসময়ে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। সে অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

তবে গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। শুধু জানিয়েছেন, ‘পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’

একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বেতন-ভাতা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি করা হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করা হবে। তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে কিংবা বেতন বৃদ্ধির হার কত হবে—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

বাজেট বক্তৃতায় ছিল ১ জুলাইয়ের ঘোষণা

নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।’ কিন্তু নতুন অর্থবছর শুরু হলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা এখনো অপেক্ষায় আছেন।

গেজেট প্রকাশ কবে?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পে স্কেলের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক পর্যালোচনা শেষে চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি অথবা শেষ সপ্তাহে গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পে স্কেলের কাঠামো, বাস্তবায়নের ধাপ, আর্থিক প্রভাব ও সফটওয়্যার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত গেজেট জারি করা হবে।

তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, গেজেট কিছুটা দেরিতে প্রকাশ হলেও কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে গণনা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা বকেয়াসহ বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।

আগের কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?

২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার সেই সুপারিশ হুবহু গ্রহণ করেনি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি দেশের রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন খসড়া তৈরি করেছে। বর্তমানে সেই খসড়ার ভিত্তিতেই গেজেট চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রস্তুতি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা ও পেনশনভোগীদের সমন্বিত সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ১১ বছর পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হবে। তবে এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য বাজার চাপ মোকাবেলা করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

অপেক্ষায় চাকরিজীবীরা

সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ছিল নতুন অর্থবছরের শুরুতেই গেজেট প্রকাশ করা হবে এবং বেতন বৃদ্ধির কাঠামো স্পষ্ট হবে। কিন্তু জুলাইয়ের দ্বিতীয় দিনেও গেজেট প্রকাশিত না হওয়ায় তাঁরা  অপেক্ষায় উদগ্রীব। বিশেষ করে বেতন কত বাড়বে, কোন ধাপে কার্যকর হবে, ভাতা কখন যুক্ত হবে এবং অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধা কিভাবে নির্ধারণ করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয়েই চূড়ান্ত রূপ পাবে নতুন পে স্কেল। তবে গেজেট প্রকাশে যত দেরি হবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তত বাড়বে। ফলে দ্রুত গেজেট জারি করে পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।