Image description

আগামী অক্টোবর মাসেই শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে।

এমন ধারণা নিয়েই নির্বাচন কমিশন (ইসি) চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। প্রস্তুত করা হয়েছে প্রয়োজনীয় পথনকশা। এই নির্বাচন আয়োজনে কী কী কাজ করা প্রয়োজন, কোথায় ঘাটতি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইসি ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়াও উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য পৃথক চারটি কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) চূড়ান্ত করেছে।

ইসি বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভবনা ৮০ শতাংশেরও বেশি। সেভাবেই প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ইসির চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার ছাপ পড়েছে ভোটের মাঠেও। দেশের বেশির ভাগ জেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন।

ব্যানার-ফেস্টুন ছাপছেন। ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রচার চালাচ্ছেন। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও। সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই মূলত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদের প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকরা নির্বাচনী দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

ইসির রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আইন, নির্বাচন বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও একীভূতকরণ সম্পন্ন করা হবে। ইসির নির্বাচন অধিশাখার একটি সূত্র বলছে, অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির সুবিধার্থে ১ অক্টোবরকে নির্বাচন শুরুর দিন হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই ভোটের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হবে। ভোটের দিনের ৪১ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণার সামগ্রিক ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্তত ৮০ শতাংশ নিশ্চিত, স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট আগে শুরু হবে। পাশাপাশি পৌরসভার ভোটও হতে পারে। ভোট অক্টোবর, নভেম্বর বা ডিসেম্বর—যে সময় থেকেই হোক, আমরা অক্টোবর ধরে কাজ এগোচ্ছি। অক্টোবরে হলে এর অন্তত ৪৫ দিন আগে শিডিউল ঘোষণা করা হবে। ভোট আয়োজনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকরাও প্রচার চালাচ্ছেন বলে আমরা খবর পাচ্ছি। গত ঈদের পর থেকে প্রায় সবাই মাঠে নেমে পড়েছেন। গ্রাম-মহল্লায় বা সড়কে ব্যানার-ফেস্টুন মারছেন। চারদিকে ভোটের আমেজ।’

এই নির্বাচন কমিশনার আরো বলেন, ‘নির্বাচনের ব্যালট বাক্স প্রস্তুত আছে। প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এবার ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা সামান্য বাড়তে পারে। আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করার জন্য মাঠ পর্যায়ে চিঠি দেওয়া হবে। প্রতি বুথে নারী ভোটার ৫০০ ও পুরুষ ভোটার ৬০০ জন নির্ধারণ করা হতে পারে। ঋণখেলাপি ও তাঁদের গ্যারান্টারদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না আইনে। এ ব্যাপারে কমিশন সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকছে।’

নির্বাচন অধিশাখা সূত্র জানায়, আগামী আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। ইসির রোডম্যাপ অনুযায়ী সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জের একাংশ), পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চল (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, উপকূলীয় দ্বীপ (হাতিয়া-সন্দ্বীপ) ও বরিশাল অঞ্চল), নদীপ্রধান ও চরাঞ্চল (কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, ও রাজবাড়ীর চরাঞ্চল) এবং সমতল ও শহরাঞ্চল (অন্যান্য সব বিভাগীয়/জেলা/উপজেলা, পৌর ও সিটি করপোরেশন)—এই চার ভাগ করে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, নদীপ্রধান ও চরাঞ্চলের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ এবং সমতল ও শহরাঞ্চলের জন্য বর্ষাকাল বাদে যেকোনো সময় নির্বাচন আয়োজনের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে নির্বাচন আয়োজন শুরু হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। তবে এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কমিশন সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় সবকিছুর পরিবর্তন করতে পারে। তবে এখানে ইসির চেয়ে সরকারের মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় নির্বাচনে সরকারের অনেক ভূমিকার প্রয়োজন হয়। সরকারের সঙ্গে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবের যোগাযোগ থাকার কথা। মূলত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইসি রেফারির ভূমিকায় থাকে। মূল কাজ সরকারের।’

জানতে চাইলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে বলেছেন, ‘ইসি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। একটি নির্বাচন করতে যা যা প্রয়োজন, আমরা সেসব নিয়ে কাজ করছি। যেন সরকার বললেই আমরা নির্বাচন করতে পারি। ভোটার তালিকা হালনাগাদে ৩১ জুলাই পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর হবে, তারা স্থানীয় নির্বাচনের ভোটার।’

ইসির চারটি রোডম্যাপে ধাপভিত্তিক নির্বাচনের কিছু চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলা হয়েছে, অতীতে এক ধাপের নির্বাচন থেকে অন্য ধাপের নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম ছিল। ফলে মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রতীক বরাদ্দ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ব্যালট পেপার পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম থাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হয়।

রোডম্যাপে নির্বাচনের সময় নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক একাডেমিক ক্যালেন্ডার, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপ নির্ধারণ করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে করণীয় সব কাজের সারসংক্ষেপও উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলা, সীমানা জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন নির্বাচন হয়নি ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদের। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ চার হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরই নির্বাচন উপযোগী হবে তিন হাজার ৯৮১টি। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।

পৌরসভার রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের মোট ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে নির্বাচন উপযোগী ৩২০টি। আইনি জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভা নির্বাচন উপযোগী নয়।

উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন পাঁচটি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। কোনো উপজেলায়ই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলো নির্বাচন উপযোগী।

রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলো নির্বাচন উপযোগী।