গতকাল (১ জুলাই) চ্যানেল আই -এর ‘টু দ্য পয়েন্ট’ নামক এক টকশোতে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি দাবি করেন, ‘‘বাংলাদেশ পুলিশের কাছে স্নাইপার ছিল না, বাংলাদেশে স্নাইপার নাই।’’
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করতে করতে গিয়ে তিনি এ দাবি করেন।
‘জুলাই’ শীর্ষক ওই টকশোর সহ-আলোচক এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘‘যাত্রাবাড়িতে যে দুইজন পুলিশকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এই পুলিশগুলো কারা ছিল তারা তো স্নাইপার ছিল। জনগণ সেখানে বাসায় উঠে একদম খুঁজে ওখান থেকে বের করে এনে সেখানে ঝুলিয়ে ছিল।’’
আলাউদ্দিন মোহাম্মদের এই কথার জবাবে নিলোফার চৌধুরী মনি উপরিউক্ত দাবি করেন।
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, নিলোফার চৌধুরী মনির দাবিটি সত্য নয়। বাংলাদেশ পুলিশ ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগের বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশ থেকে স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহ করেছে বলে শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
নেত্র নিউজ ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানে দেখায় যে, বাংলাদেশ পুলিশ কয়েক দফায় স্নাইপার রাইফেল কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে পুলিশ সদর দপ্তর ত্রিশটি ৭.৬২ মিলিমিটার স্নাইপার রাইফেল কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে।
এ নিয়ে ২০২৩ সালে নিউ এইজও একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২৩ মার্চ পুলিশ সদরদপ্তর ৩০টি ৭.৬২ মিমি স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করে।
নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘‘মার্চ ২০২৪: হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের মাত্র কয়েক মাস আগেও বাংলাদেশ পুলিশ ৭.৬২ মিলিমিটার স্নাইপার রাইফেল কেনার জন্য আরেকটি দরপত্র আহ্বান করে।
২০২৪ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশ করা এই বিজ্ঞপ্তিতে পঞ্চাশটি ৭.৬২ মিলিমিটার স্নাইপার রাইফেলের জন্য প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারীদের কাছে দরপত্র দাখিলের আহ্বান জানানো হয়।
এর আগেও পুলিশ সদস্যদের জন্য বিপুল পরিমাণ ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেল কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ১৫ হাজার ৭.৬২ মিলিমিটার সেমি-অটোমেটিক রাইফেল কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।
এছাড়াও, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী যে টাইপ-৫৬ সেমি-অটোমেটিক রাইফেল ব্যবহার করে সেগুলোতেও ৭.৬২ মিলিমিটার কার্তুজ ব্যবহার করা হয়।’’
এদিকে, ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জুলাই আন্দোলন দমাতে স্নাইপার ব্যবহারের প্রমাণ দেখানো হয়েছে।
এছাড়াও জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টেও আন্দোলন দমনে ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের লেথাল অ্যামুনিশন ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে, যা স্নাইপার রাইফেলেও ব্যবহার করা যায়।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ পুলিশের কাছে ৭.৬২ স্নাইপার রাইফেল নেই— এমন বয়ান আওয়ামী লীগ ৫ আগস্টের পর নিয়মিত প্রচার করে আসছে।
গণভ্যুত্থানের পরপরই ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয় এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, বাংলাদেশ পুলিশ ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেল ব্যবহার করে না। সেই বয়ানের পুনরাবৃত্তি হলো এই টকশোতেও।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমাতে শুধু পুলিশ গুলি করেছিল তা নয়। বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাধিক ইউনিট এবং বিভিন্ন জায়গায় বিজিবি কর্তৃক গুলি করা হয়েছে এবং তাতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন বলে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব বাহিনীতে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়।