দালালের খপ্পরে পড়ে উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবন আর বিদেশে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ থেকে হাজারো তরুণ পাড়ি জমিয়েছিলেন কম্বোডিয়ায়; কিন্তু সেখানে পৌঁছার পর তাঁদের অনেকেই জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত চাকরি বলে কিছু নেই।
কাজের কথা বলে বাংলাদেশিদের বিক্রি করে দেওয়া হতো সাইবার স্ক্যাম সেন্টার ও ক্যাসিনোতে।
জানা যায়, বিএমইটির অনুমোদন নিয়ে অনেকে গেলেও এর চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় যান দালালদের মাধ্যমে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন তাঁরাই। দালালদের পাঁচ-ছয় লাখ টাকা দিয়ে সে দেশে যাওয়ার পর কাগজপত্র করা, ভিসার মেয়াদ না থাকলে পুনরায় মেয়াদ বাড়ানো এবং কাজ চাইলে স্ক্যাম সেন্টারে কম্বোডিয়ায় থাকা বাংলাদেশি দালালরা স্ক্যাম সেন্টার বা ক্যাসিনোতে কাজ দিতেন বা বিক্রি করে দিতেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, দালালদের প্রলোভনে পড়ে অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে যান। এভাবে বিদেশে গিয়ে কেউ প্রতারণা বা স্ক্যামের শিকার হলে সরকারের কিছু করার সুযোগ সীমিত থাকে।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, এর পরও যদি কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নোয়াখালীর সেনবাগের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল শাকিল গত ফেব্রুয়ারিতে দালালের মাধ্যমে ভ্রমণ ভিসায় কম্বোডিয়ায় যান। প্রতিশ্রুতি ছিল মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বেতনের চাকরি। সেই আশায় প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যান তিনি।
কালের কণ্ঠকে শাকিল বলেন, ‘কম্বোডিয়ায় পৌঁছে দেখি কোনো চাকরি নেই। পরে আমাদের একটি স্ক্যাম সেন্টারের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে প্রতারণার কাজ করতে না চাইলে নির্যাতন শুরু হয়। দেশে ফিরতে চাইলে নির্যাতন আরো বাড়ানো হয়। পরে মুক্তির শর্ত হিসেবে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা পরিবারের সদস্যরা পাঠানোর পর নিজের খরচে দেশে ফিরে আসি।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকার বাসিন্দা সিহাবুল ইসলাম। তাঁকেও একটি স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। সিহাবুল বলেন, ‘ছয় লাখ টাকা খরচ করে গিয়েছিলাম। পরে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দেশে ফিরে এসেছি। বর্তমানে কম্বোডিয়া সরকার সাইবার স্ক্যামের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করায় অনেকেই দেশে ফিরছেন।’ জানা যায়, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি দালালচক্র বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ড ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়। দক্ষতা অনুযায়ী একেকজনের দাম নির্ধারণ করা হতো এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত। কম্বোডিয়ায় পৌঁছার পরই অফিশিয়াল কাজের অজুহাতে কর্মীদের পাসপোর্ট নিয়ে রাখা হতো। পরে সেই পাসপোর্ট জিম্মি করে কিংবা মুক্তির শর্তে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হতো।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক আল-আমিন নয়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি তথ্য মতে গত মে মাস থেকে এ পর্যন্ত কম্বোডিয়া থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে ব্র্যাকের সহায়তায় ফিরেছেন ৫৮৩ জন। ফিরে আসা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগই বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন। তাই সেখানে গিয়ে যদি কর্মী প্রতিশ্রুত কম্পানি বা চাকরি না পান, তাহলে এর দায় বিএমইটি ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ায় এই স্ক্যাম সেন্টার ও সাইবার ক্রাইম বন্ধে বড় ধরনের অভিযান চালায় সে দেশের সরকার। এতে সে দেশে এ সমস্যা অনেকটা বন্ধ হয়ে এসেছে, তবে তৈরি হয়েছে নতুন মানবিক সংকট। জাতিসংঘের তথ্য মতে, পাচারকারী চক্রের কাছে পাসপোর্ট আটকে থাকায় উদ্ধার হওয়া হাজারো বিদেশি নাগরিক নিজ দেশে ফিরতে পারছেন না।
তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কম্বোডিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য নতুন করে বিএমইটি ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে কারা পাচারকারী, কারা প্রলোভন দেখিয়েছে এবং কোনো বাংলাদেশি চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তা চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগীরা যেন দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।